জেন Z-এর গল্প : যে চাকরিটা পাওয়ার জন্য সারাক্ষণ দৌড়াই, সেটা যখন পাওয়ার পালা...

স্বপ্নের চাকরীটা পাওয়ার পরে এবং সেখানে পদোন্নতি পেয়ে নিজেকে হারানো এক Gen Z-এর ‘বার্নআউট’ হওয়া আর সেখান থেকে জীবনের প্রতি ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প পড়ুন। এটি আজকের দিনের  তরুণ-তরুণীদের মানসিক চাপ ও ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্সের এক প্রাসঙ্গিক কাহিনী।

এক যুবক বিষণ্ণ মনে চুপ করে বসে আছে - বাংলা গল্প Gen Z বার্নআউট

আমি বেঁচে নেই, শুধু শ্বাস নিচ্ছি মাত্র ...

দুপুর একটা বাজে। রুমের পর্দা টানা। জানালার ফাঁকে ফাঁকে ঢোকা রোদ বালিশের ওপর লম্বা একটা দাগ ফেলে রেখেছে। আজ মাত্র সপ্তাহ খানেক হলো আমি অবশেষে সোফায় শুয়ে সিরিজ দেখার সেই ফেজে পৌঁছেছি, যেখানে রিমোট কন্ট্রোলের ব্যাটারিও শেষ হয়ে গেছে, অথচ সেটা বদলাতে উঠতে ইচ্ছে করে না। সামনে টেবিলে একটা শুকিয়ে যাওয়া কফির কাপ আর খোলা ল্যাপটপ—যার স্ক্রিনে এখনো ‘হায়ারিং প্রসেস কমপ্লিটেড’ মেসেজটা জ্বলজ্বল করছে।

হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন।

আমি সেই চাকরিটা পেয়ে গেছি। যে চাকরিটা পাওয়ার জন্য গত তিন বছর রাত-দিন এক করেছিলাম, যার জন্য ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, লিঙ্কডইন সব জায়গায় ‘পজিটিভ মাইন্ডসেট’ দিয়ে সাজিয়ে রেখেছিলাম প্রোফাইল, যার জন্য ফ্ল্যাটে এ.সি না চালিয়ে গরমে ঘাম ঝরিয়ে পয়সা বাঁচাতাম,আর  ইন্টার্নশিপের জন্য সর্বশেষ আইফোনটা কিনেছিলাম।

কিন্তু কেন? কেন এখনো আমার ভেতরটা খালি?

ভোর ৫টায় অ্যালার্ম — পুরনো সেই আমি, যার স্বপ্ন ছিল একটা বড় জার্নি....

আমার নাম রায়ান। বয়স চব্বিশ। কোনো অশ্রদ্ধা নয়, কিন্তু একদম জিনুইন জেন Zee ।

সবাই একসময় কমবয়সে স্বপ্ন দেখে। তবে আমাদের সময়ের স্বপ্নগুলো একটু অন্যরকম। শুধু বড় হওয়া নয়, বড় হওয়ার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘এসথেটিক’ থাকাটাও সমান জরুরি।

চাকরি পাওয়ার আগের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে।

বিকেল ৫টায় অফিস। রাত ১০টায় ভার্চুয়াল মেন্টরশিপ। রাত ১টায় পোর্টফোলিও আপডেট। রাতে মা ফোন করে শুধু জিজ্ঞেস করেন— “খেয়েছিস?” আর ওদিকে বাবা টেনশনে থাকেন— “চাকরিটা না পেলে কী ভাববে পাড়ার লোকেরা?”

ওদের দোষ দিতে ইচ্ছে করে না। কারণ এ দেশে চাকরি পাওয়াটা কখনো শুধু আয়ের উৎস ছিল না, এটা ছিল একটা সামাজিক সার্টিফিকেট।

মনে পড়ে, ঠিক দু’বছর আগে প্রথম রিজেক্টেড হয়েছিলাম। সেদিনের সেই অনুভূতি খুব বেশি টের পাইনি। বরং সন্ধ্যায় বন্ধু রিয়াকে নিয়ে রেস্তোরাঁয় গিয়ে একটা পুরো পিৎজ়া খেয়ে ফেলি। ও বলেছিল, “আরে! একটা রিজেকশন তোর ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেবে না। আরে, ওরা তোর যোগ্যও নয়। তারপরও তো তুই চেষ্টা করবি বা করছিস। এটাই তো বড় কথা।”

সেদিন হয়তো সত্যিটা ছিল যে, আমি তখনো পুরোপুরি আপ্রাণ চেষ্টা করিনি।

যখন পদোন্নতির প্রস্তাব সামনে এসে দাঁড় করায় জীবনের এক নতুন মোড়ে ....

গত মার্চে কল করলেন মিসেস রহমান—বাঙ্গালোরের অফিসের সিনিয়র ম্যানেজার—উনি প্রমোশনের প্রস্তাবটা দিলেন।

“কনগ্র্যাচুলেশনস মি: রায়ান! আপনার পরিশ্রম দেখে আমরা সত্যিই মুগ্ধ। আমরা মনে করি আপনি এখন থেকে সিনিয়র পজিশনের দায়িত্ব নিতে পারবেন।”

হাতে ফোন। মাথাটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়। শুধু ‘কনগ্র্যাচুলেশনস’ শব্দটাই কয়েকবার ঘুরপাক খেতে লাগল। কান্না পেলো না, বরং বুকটা কেমন যেন শক্ত হয়ে গেল। এই মুহূর্তটার জন্য কত রাত জেগেছিলাম? কত পরিকল্পনা বানিয়েছিলাম?

কিন্তু তখন বুঝতে পারিনি, এই সুখটা আমার অহংকারের কাছে হেরে যাবে।

কিছুদিন পরেই অফিসের কাজ আমার উপর চাপ সৃষ্টি করতে লাগলো । ৯টার জায়গায় সকাল ৭টায় পৌঁছানো। রাত ১০টায় বেরোনো। সকালে চা খাওয়ার সময়টুকুও ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ মিটিংয়ে কেটে যেত।

আস্তে আস্তে আমার নিজেকে হারানোর গল্পের শুরুটা সেখানেই।

পুরনো রায়ান আর নেই — তার জায়গায় বড় হয়েছে এক গভীর শূন্যতা...

দিন গড়ায়। সপ্তাহ পেরোয়। মাস চলে যায়।

অফিসের কাজের চাপটাও যেন ধীরে ধীরে আমার পার্সোনালিটির চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া তৈরী করতে শুরু করে।

একদিন সকালে স্নান করার সময় আয়নায় তাকিয়ে নিজের চোখে নিজেকে যেন চিনতে পারলাম না। রায়ান—যে মজা করে, আড্ডা দেয়, যার জন্য বন্ধুরা বলে ‘টোটাল পজিটিভ ভাইবস’—সে এখন কোথায়?

তুমি কি জানো ? চাকরি যখন আপনার সত্তাকে গ্রাস করতে শুরু করে, তখন আর ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্সনামক কোনও শব্দের অজুহাত চলে না, বাঁচাটাই কঠিন হয়ে ওঠে।

আমি আস্তে আস্তে সবাইকে ‘ব্যস্ত আছি’ বলতে শুরু করলাম। পারিবারিক সব জমায়েতে ‘ছুটি নেই’ বলতে বাধ্য হতাম । বন্ধুদের গ্রুপে চ্যাট পড়ে থাকতো, উত্তর দেওয়ার মতো শক্তি থাকতো না।

শুধু একটা বিষয় আমার মাঝে বাসা বাঁধছিল— উদাসীনতা। 

কোনো কাজে ভালো লাগা খুঁজে পেতাম না। ওই যে ‘বডি অ্যাচ’ হয়, মাইগ্রেন হয়, সেটার সঙ্গে একটা আমার একটা ইনভিজিবল-ফ্লু ছিল, যার নাম বার্নআউট।

মনে পড়ে রিয়া একবার ফোন করে বলেছিল, “আমি তোকে তিন সপ্তাহ ধরে মেসেজ করেও কোনো রেসপন্স পাই না। দশটা মিনিট একবার আমার জন্য বের করে নে।” আর আমি উত্তর দিয়েছিলাম, “সময় নেই রিয়া। অফিসটা আমাকে খাচ্ছে, খেয়ে ফেলছে ।”

ও ভেবেছিল হয়তো আমার মন খারাপ। কিন্তু সত্যিটা ভয়ংকর—আমার অফিসটা সত্যি সত্যি আমাকে ভেতর থেকে শুষে নিচ্ছিলো, আমাকে নি:শেষ করে দিচ্ছিলো । প্রতিঘাত হচ্ছিলো ভয়ঙ্কর আমার ভিতরের সঙ্গে আমার বাইরের ।

টেবিলে ল্যাপটপ, ফাইলের পাহাড় আর কফির কাপ - ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স নিয়ে Gen Z গল্প

যখন হঠাৎ একদিন থেমে যেতে বলল শরীর.....

২০২৫-এর ১৫ই নভেম্বর তারিখে লিখে রাখার মতো ঘটনা ঘটলো আমার জীবনে ঘটলো।

মাঝরাতে হঠাৎই মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। রাতে বাথরুম থেকে ফিরে জল খেতে গিয়ে চোখের সামনেই অন্ধকার। নীচে পড়ে যাই। পড়ে যাওয়ার শব্দ আমার ফ্ল্যাটমেট ছুটে আসে, অ্যাম্বুলেন্স ডাকে, আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যখন চোখ খুললাম, তখন পাশে কেউ ছিল না। চারদিকে সাদা দেয়াল। রাত ২টার দিকে ডাক্তার বললেন— “অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে আপনার নার্ভাস সিস্টেম কিছুক্ষণের জন্য শাট-ডাউন হয়ে গেছিল। কয়েক সপ্তাহ সম্পূর্ণ বিশ্রাম দরকার। তা না হলে…”

তিনি কথা শেষ করলেন না। শুধু বললেন, “ইয়ং ম্যান, কিন্তু কিসের জন্য এত চাপ, এত দৌড়?”

আমি চুপ করে শুধু কয়েকফোঁটা চোখের জল ফেললাম।

আমার শরীর আমার থামার সময় এসে গেছে বলে পাল্টা সংকেত দিয়েছিলো।

কিন্তু কী করে থামি?

পদোন্নতি। লোভনীয় বেতন। বাবা-মায়ের গর্ব। সবকিছু ছেড়ে যেতে পারবো?

সেই ভোরবেলায় আমার জেগে ওঠাটা কোনো সিরিজের দৃশ্য ছিল না, কিন্তু ছিলো বাস্তবের সত্যি কঠিন পরীক্ষা।

যখন নিজেকে খুঁজে পাওয়ার স্বাদটাই ভালো বলে মনে হয় ....

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে প্রকৃত শিক্ষাটা পেলাম।

পদোন্নতি আমাকে শুধু ‘সিনিয়র’ উপাধিটা দিয়েছিল, কিন্তু স্বপ্ন দেখার স্বাধীনতাটা কেড়ে নিয়েছিলো ।

ডাক্তার যখন বললেন, “আপনার রুটিন পাল্টাতে হবে,” আমি প্রথমে ভেবেছিলাম এটা তো অসম্ভব। কিন্তু তার পরের সপ্তাহে বাড়ি ফিরে যখন দেখা হলো এক খুব কাছের বন্ধুর সঙ্গে, কিন্তু যার সঙ্গে  অনেকদিন দেখা হয়নি—যখন ও আমাকে বললো, “তুই কিন্তু আর সেই রায়ান নেই। তুই একটা রোবটে পরিণত হয়েছিস।”

তার এই কথাটা যেন আমায় ভিতর থেকে নাড়া দিয়ে গেল।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—আমি পদত্যাগ করবো।

অফিসের ম্যানেজার ভেবেছিলেন মজা করছি। এমনকি এই ছেড়ে দিলে আর কোনো প্রতিষ্ঠান আমাকে কাজে নেবে না, এমন কঠিন ভয্ও দেখিয়েছিলেন।

কিন্তু সত্যি বলতে, ভয় পাইনি। কারণ যা হারাতে বসেছিলাম, সেটা ছিল আমার নিজের আত্মা।

আমি জানতাম, ২০২৫ এসে গেছে, এতবছর—আর এখনও ‘জব সিকিউরিটি’ আর ‘পদমর্যাদা’কে সবকিছুর চেয়ে বড় করে দেখা আমাদের সমাজের একটা রোগ। আমরা সবাই টিকে থাকতে চাইতাম। কিন্তু আমি বাঁচতে চাইলাম, নিজের মতো করে।

আমি নিজের মতো করে একটি ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ শুরু করলাম—অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়া বাদ দিলাম কিছুদিনের জন্য। ছোট ছোট কাজে আনন্দ খুঁজে নিতে শুরু করলাম—সকালবেলা সাইকেল চালানো, ফ্রিল্যান্সিংয়ের চিন্তা করে নতুন কিছু শেখা।

বিষয়টা সহজ ছিল না। প্রথম সপ্তাহটায় মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো মাদকের নেশা ছাড়ছি। ফাঁকা সময় মেনে নিতে কষ্ট হতো। তবে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম।

ছোট হলেও যখন আবার শ্বাস নেওয়ার স্বাদ ফিরে পেলাম...

বর্তমানে আমার দু’টো ব্লগ রয়েছে । আগের যে চাকরি করতাম, সেটার থেকে কিছুটা সেভিংস রয়েছে । তা দিয়ে আপাতত চলছে।

ছোটবেলার বন্ধুদের কাছে ফিরে গেছি। মা বাবাও এত দিনে সত্যি বুঝতে পেরেছেন, চাকরি ছাড়া ছেলেটা কিন্তু আরও বেশি হাসিখুশি।

মনে আছে––একদিন হঠাৎ মা বলেছিল, “তুই যাই করিস, যেন ভালো থাকিস। আর কিছু চাই না। টাকা দিয়ে কি হবে তুই অসুস্থ হয়ে পড়লে?”

প্রথমটায় ওদের বোঝাতে কষ্ট হয়েছিলো। কিন্তু ওদের ভালোবাসা অবশেষে আমি ফিরে পেয়েছি।

আমি যে বেঁচে আছি, চাকরিই জীবনের সবকিছু না, সেটা এই রোগটাই আমাকে শিক্ষা দিয়ে গেল।

‘পদোন্নতি পেতে পেতে নিজের প্রতি পদোন্নতি দেওয়াটাই আসল সাফল্য।’

আজ আমি সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কাউকে বলতে চাই—

তোমাদের গল্পগুলোর মাঝে যদি এই গল্পের ছোঁয়া থাকে, তাহলে দয়া করে থামো। নিজেকে একটু ভালোবাসো। ওভারটাইম নয়, “মি টাইম” দেওয়াটা সব থেকে জরুরি।

কারণ আমরা সবাই জেন Z —আমাদের প্রজন্ম খুব জোরে কথা বলে, খুব জোরে স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সব থেকে দ্রুত ভেঙে পড়ে। তাই নিজেকে প্রায়োরিটাইজ করা শেখো।

আপনার গল্পের মোড় পালটে ফেলার অধিকার শুধু আপনার হাতে।

– রায়ানের ডায়েরি থেকে


গল্পটা ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না। মন্তব্য করে জানাতে পারেন আপনার মতামত।


যদি আপনি বাংলা গল্প পড়তে ভালোবাসেন, তাহলে "গল্পের ঝুলি"তে আপনাকে স্বাগত । এখানে পাবেন ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের মৌলিক গল্প । আপনার পছন্দ অনুযায়ী সরাসরি বিষয় বাছতে নীচের ট্যাগে ক্লিক করতে পারেন - 

# ভালোবাসার গল্প# ভৌতিক গল্প# রহস্য গল্প# কল্পবিজ্ঞানের গল্প #

# জীবন-অনুভূতির গল্প# বাংলা ছোট গল্প# শিক্ষণীয় গল্প# সিরিজ গল্প #


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন