আগে যা ঘটেছিলো ...
প্রচন্ড খরায় জ্বলছিলো কোলকাতা এবং গোটা রাজ্য । অনির্বাণ নামের বাঙালী বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেছিলেন ‘মেঘদূত’ নামের এক যন্ত্র । যদিও তার উদ্দেশ্য ছিলো মেঘকে নিয়ন্ত্রণ করা, কিন্তু আসলে মেঘের পেছনে থাকা উন্নত অন্য গ্রহের প্রানীদের মাধ্যম হয়ে উঠলো সেই যন্ত্র ।
ভিনগ্রহের বার্তাবাহকরা পৃথিবীতে নেমে এসে জানিয়েছিলো – পৃথিবী ধ্বংসের পথে । মানুষ নিজে পৃথিবীকে ধ্বংস করছে । তাই তারা সময় দিয়েছিলো পাঁচ বছর । কোলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ তাদের শর্ত পূরণ করলেও তারা নতুন শর্ত চাপায়, সমস্ত পৃথিবীকে সচেতন করার আর সেই দায়িত্বের জন্য তারা বেছে নেয় অনির্বাণকে আর তার হাতে তুলে দেয় স্ফটিক গাছের বীজ ।
সিরিজের আগের পর্বগুলি :
পর্ব ১ : মেঘের বার্তাবাহক
পর্ব ২ : সোনালি আলোর বার্তা
পর্ব ৩ : স্ফটিক বীজের রহস্য
মেঘের বার্তাবাহক (চতুর্থ পর্ব) : মহাযাত্রার শুরু
২০৯০ সাল । আমাজনের গভীর জঙ্গল । অনির্বাণ আর ঋষির প্রথনবার আমাজনে আসার পর পাঁচটা বছর কেটে গেছে । এখন ঋষির বয়স কুড়ি । তার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে দায়িত্ববোধ । অনির্বাণের চুলে হালকা পাক ধরেছে, কিন্তু তার উজ্জ্বল চোখের দৃষ্টি এখনো আগের মতোই বুদ্ধিদীপ্ত, তীক্ষ্ণ ।
পাঁচ বছর আগে যে স্ফটিক বীজ তারা পুঁতেছিলো আমাজনের এক মৃতপ্রায় জায়গায় – যেখানে পোড়া জমি ছাড়া প্রায় আর কিছুই ছিলো না । আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক অপরূপ সুন্দর গাছ । স্ফটিক গাছ । তার প্রতিটা পাতা দিনের আলোয় ঝলমল করে । রাতের বেলায় গাছটির চারপাশে আলোকিত হয়ে ওঠে । স্থানীয় আদিবাসীরা গাছটির নাম দিয়েছে “চন্দ্রবৃক্ষ” ।
অনির্বাণ গাছটির নীচে মেডিটেশনে বসে যায় । যখনই সে আমাজনে আসে, এই গাছের নীচে বসে সে মেডিটেশন করে । আর গাছ যেন তাকে ধ্যানের মধ্যে দেখিয়ে দেয় – কোথায় এখনো জঙ্গলে আগুন জ্বলছে, কোথায় এখনো মানুষ ভালোবাসতে শেখেনি প্রকৃতিকে, গাছকে, পৃথিবীকে । সেই গাছ যেন তাকে দিকনির্দেশ করে দেয় তার কাজের ।
সেই দিনও সে বসেছিলো মেডিটেশনে । হঠাৎ ঋষি দৌড়তে দৌড়তে সেখানে আসে । “কাকু, কাকু ! তাদের বার্তা এসেছে । ওরা আবার আসছে ।“ আসলে এখন ঋষি তার সহযোগী । সে মেঘদূত অপারেট করতে জানে ।
অনির্বাণ চোখ খোলে । আকাশের দিকে তাকায় । সে দেখতে পায় এক ঝাঁক সোনলী মেঘ এগিয়ে আসছে আমাজনের দিকে । কিন্তু এবার তো শুধু তারা একা নয় ! অনির্বাণ দেখতে পায় এক প্রকান্ড মেঘ সেই সোনালী মেঘের পিছনে আসছে । অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বুঝতে পারে, সেটি মেঘ নয়, এক প্রকান্ড মহাকাশযান । সে বলে ওঠে, “বোথহয় এবার চূড়ান্ত বিচার ।“ উঠে দাড়ায় অনির্বাণ আর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঋষিকে বলে, “চল্ ঋষি, ওদের স্বাগত জানাই ।“
চূড়ান্ত বিচার
বার্তাবাহকরা স্ফটিক গাছের সামনে এসে থামলো । ধীরে ধীরে তারা এগিয়ে এলো ঋষি আর অনির্বাণের সামনে । একজন বার্তাবাহক এগিয়ে এলো । এবার তার চোখে যেন সামান্য ক্লান্তির ছায়া । যেন বহু দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে ।
“অনির্বাণ, পাচ বছর পেরিয়ে গেছে । আমরা দেখেছি, সব দেখেছি ।“
অনির্বাণ মাথা নোয়ায় এবং বলে, বলুন আমাদের জন্য কি নির্দেশ । আমরা তৈরী ।“
বার্তাবাহক হাত নাড়ালো । সঙ্গে সঙ্গে আকাশ জুড়ে ভেসে উঠলো পৃথিবীর ছবি । তারা দেখালো সবুজে ভরা কোলকাতা তথা গোটা ভারতবর্ষ । দেখালো সেখানে গাছের সংখ্যা প্রায় সত্তর লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছে । দেখালো ভারতের বিভিন্ন প্লাস্টিকমুক্ত শহরের ছবি । দেখালো ভারতের নদীতে ফিরে আসা ডলফিনের ঝাঁক ।
অনির্বাণ আবেগে কাপছিলো, তার চোখে নেমে এসেছিলো জলের ধারা । কিন্তু বার্তাবাহক পরের ছবিতে এগিয়ে গেলো । দেখালো পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ছবি । সেখানে কোথাও এখনো জ্বলছে জঙ্গল । কোন জায়গায় মরুভূমি গ্রাস করছে চারণভূমি । কোথাও সমুদ্রে ভাসছে প্লাস্টিকের ছোট ছোট দ্বীপ । কোথাও গলেছে পাহাড়ের বরফ ।
অনির্বাণ চোখ নামিয়ে নেয় । বার্তাবাহক বলে ওঠে, তুমি খুবই চেষ্টা করেছো অনির্বাণ । আমরা সব দেখেছি । তোমাদের রাজ্য এবং দে্শও খুব ভালো করেছে । কিন্তু শুধু তোমরাই তো ভালো করলে হবে না । পুরো পৃথিবীকেই ভালো করতে হবে।“
শেষ সুযোগ
“তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ।“ বার্তাবাহকের গলা এবার যেন একটু কঠোর হয় । চারিপাশের পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়ায় । পাখিরাও যেন নীরব হয়ে গেছে । অনির্বাণ যেন আর দাড়িয়ে থাকতে পারে না । অজানা আশঙ্কায় তার বুক কাঁপতে থাকে । ঋষি তার পাশে এসে দাঁড়ায় ।
বার্তাবাহক বলতে থাকে – “পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাচাতে আমরা অবশ্যই হস্তক্ষেপ করবো । কিন্তু তোমার, তোমাদের প্রচেষ্টাকে আমরা মূল্য দিতে চাই । তাই আমরা তোমায় দেবো আরো দশ বছর । আগামী দশ বছরের মধ্যে পৃথিবীর প্রতিটা দেশকেই দেখাতে হবে যে, তারা সত্যিই বদলাতে চায় । আর তার জন্য তোমায় সাহায্য করবে এই বীজগুলো ।“
বার্তাবাহক সেই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের নির্দেশে খুলে যায় সেই মহাকাশযানের দরজা । আর তার মধ্যে থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেমে আসতে থাকে হাজার হাজার স্ফটিক বীজ । বার্তাবাহক আবার বলে ওঠে, “এই বীজগুলো নাও । পৌছে দাও প্রতিটা দেশে, প্রতিটা দেশের গ্রামে, শহরে । পৌছে দাও সেখানে এখনো রয়েছে পৃথিবীর ক্ষত । সেখানে এই বীজ পুঁতে দাও । এগুলো থেকে জন্মাবে নতুন বন । কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, শুধু গাছ লাগালেই হবে না । ভালোবাসতে হবে । সারা পৃথিবীর মানুষকে শেখাতে হবে প্রকৃতি কি, জীবন কি ।“
অনির্বাণ এগিয়ে গিয়ে মাটিতে থাকা একটি স্ফটিক বীজ হাতে তুলে নিয়ে বলে, “আমরা পারবো, আমাদের পারতেই হবে । আমি কথা দিচ্ছি ।“
বার্তাবাহক অনির্বাণের চোখে চোখ রাখে । “জানি পারবে । তুমি যথেষ্ট চেষ্টা করেছো, আর তাই পৃথিবী আরও একটা সুযোগ পেলো । আর তুমি পারবে বলেই তোমাকে বেছে নেওয়া হয়েছিলো । কিন্তু মনে রেখো এরপর কিন্তু আর কোন বার্তাবাহক আসবে না । এরপর আসবে মহাপ্রলয় । মনে রেখো, এটাই কিন্তু শেষ সুযোগ । “
প্রত্যাবর্তন
বার্তাবাহকরা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো মহাকাশযানে । তারপর সেই মহাকাশযান ধীরে ধীরে তারপর হঠাৎ দ্রুত গতিতে হারিয়ে গেলো মেঘের মধ্যে । আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেলো সেই সোনালী মেঘের ঝাঁক । আকাশ থেকে নামলো বৃষ্টি – ঘন বৃষ্টি, শীতল বৃষ্টি, নিয়ে এলো যেন এক স্বস্তির বার্তা ।
অনির্বাণ তখনো স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়েছিলো । তার চেতনা ফিরে এলো ঋষির কন্ঠস্বরে । “কাকু, এই এতো বীজ ! আমরা দু’জনে মিলে কিভাবে পৃথিবীর সব জায়গায় এগুলোকে পৌছে দেবো?”
অনির্বাণ শান্ত-স্মিত হাসিভরা মুখ নিয়ে বলে, “আমরা দু’জনে নয় – সবাই মিলে । এবারে তৈরী করতে হবে বিশ্ববিপ্লব ।“
অনির্বাণ ধীর পায়ে আবার গিয়ে বসে সেই স্ফটিক গাছের নীচে । আর পকেট থেকে একটা ছোট ডায়েরী বার করে লিখতে থাকে – “২০৯০ সালের এই দিনে, আমাজনের বুকে, মানবসভ্যতা পেলো শেষ সুযোগ । বার্তাবাহকরা চলে গেছে, আর আসবে না । এবার আমাদের একাই লড়তে হবে । আমাদের, সবাইকে-প্রতিটা মানুষকে । কিন্তু আমরা একা নই । আমাদের সঙ্গে আছে প্রতিটা গাছ, প্রতিটা নদী, প্রতিটা প্রাণী । আমাদের সঙ্গে আছে আগামী প্রজন্ম । আমাদের হাতেই এখন সারা পৃথিবীর মানবজাতির ভবিষ্যৎ ।“
বিশ্ববিপ্লব
পরবর্তী দশটা বছর পৃথিবীর ইতিহাস সবচেয়ে বড় এক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে রইলো । অনির্বাণ আর ঋষি ঘুরে বেড়াতে লাগলো পৃথিবীর প্রতিটা কোণায়-কোণায়, শহরে-গ্রামে । ভারতীয় সরকার প্রতিটা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করলো এই ব্যাপারে । প্রতিটা দেশের সরকার তাদের এই কর্মযজ্ঞে সহায়তা করলো । কখনো তারা আফ্রিকার মরুভূমিতে পুতলো সেই স্ফটিক বীজ, কখনো এশিয়ার দূষিত শহরগুলোয়, কখনো ইউরোপের শিল্পাঞ্চলে, কখনো দাবানলে পুড়ে যাওয়া আমেরিকার জঙ্গলে । আবার কখনো বা বিশ্ববিদ্যালয়ে করলো সম্মেলন, কখনো স্কুলে গিয়ে বোঝালো, পড়ালো প্রকৃতিকে ভালোবাসার, গাছকে ভালোবাসার প্রথম পাঠ । কখনো বা কোন দেশের সরকরকে সহায়তা করতে হলো শিশুদের স্কুলে পঠনপাঠনের জন্য সিলেবাস তৈরীর কাজে । সেই সিলেবাস অনুযায়ী কিভাবে পড়াতে হবে, কিভাবে শিক্ষক-শিক্ষিকারা অনুপ্রাণিত করবেন শিশুদের গাছকে-প্রকৃতিকে ভালোবাসতে সেই ট্রেনিং দিতে হলো বিভিন্ন দেশে ।
এর মধ্যেই ঋষি এখন নামকরা ভূ-বিজ্ঞানী । ডিজিটাল মাধ্যমে কাকুর সঙ্গে সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতেই সে শেষ করেছে তার পড়াশোনা, গবেষণা । পৃথিবীর চারিদিকে অঙ্কুরিত হয়ে বেড়ে উঠতে লাগলো স্ফটিক গাছেরা । তাদের দেওয়া অক্সিজেনে নির্মল করে তুলোলো বাতাস । সিশুদের শ্বাসকষ্ট জনিত রোগ প্রায় দুর্লভ ঘটনা হয়ে বসেছে । বৃদ্ধদের আয়ু বাড়তে শুরু করেছে ।
দশ বছরের মাথায় সারা পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি জুড়ে তৈরী হয়ে উঠলো সবুজের সমারোহ । সারা বিশ্বের স্কুলে স্কুলে এখন বাধ্যতামূলক পাঠ হলো, “পৃথিবী ও প্রকৃতি পাঠ”। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শুরু হলো সেই বিষয়ের উপর ডিগ্রী এবং তার উপরে গবেষণার সুযোগ । শিশুরা এখন স্কুলে গিয়ে শেখে কিভাবে গাছ লাগাতে হয়, কিভাবে তাদের লালন-পালন করতে হয়, কিভাবে তাদের ভালোবাসতে হয়, কিভাবে নদী বাচাতে হয়, কেন প্লাস্টিক এড়িয়ে চলতে হয় । মানুষ এখন অনেক বদলাতে শিখেছে ।
ফিরে দেখা
বহু বছর পরে অনির্বাণ ফিরে এসেছে কোলকাতায় । এখন সে প্রৌঢ় আর ঋষি উদ্যমী, কর্মঠ যুবক । কোলকাতা শহরে ফিরে তাদের চোখ ছানাবড়া হওয়ার যোগাড় । কোলকাতা সম্পূর্ণ বদলে গেছে । সে এখন এক সবুজে ঘেরা নগরী, সত্যিকারের তিলোত্তমা । প্রতিটা বাড়ির ছাদে, বারান্দায় বাগান । প্রতিটা রাস্তার ধারে সবুজে সবুজে ভরা গাছের সারি । সমস্ত যানবাহন বিদ্যুৎচালিত, শব্দহীন-ধোঁয়াহীন । রাস্তায় রাস্তায় ডিজিটাল বোর্ডের সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ড্যাশবোর্ডে ফুটে ওঠা নির্দেশ অনুযায়ী সমস্ত ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে । কোথাও কোন হঠকারিতা নেই, সমস্ত কিছু সুন্দর সুশৃঙ্খল ছন্দে বাঁধা । সমস্ত মানুষজন হাসিখুশি, ভদ্র-অমায়িক ব্যবহার করছে একে অপরের সঙ্গে ।
গাড়িতে করে আসার সময় ড্রাইভার তার নির্দেশে এসে দাঁড়ালো আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের সামনে । অফিসের সামনেই মস্ত বড় কাঁচের বাক্সে সযত্নে রাখা হয়েছে তার মেঘদূত ১.০ যন্ত্রটিকে - স্মৃতি হিসাবে । যন্ত্রের ঠিক নীচে অনির্বাণের বিশাল বড় ছবি-যুবক বয়সের । অনির্বাণ সেখানে দাঁড়িয়ে চশমাটা খুলে তার চোখদুটো একবার মুছে নেয় ।
সেই স্মৃতিসৌধের সামনে গাছের নীচে কয়েকজন শিশু ছবি আঁকছিলো । তার পাশেই একটা ছোট্ট পার্কে অনেক শিশু খেলা করছিলো । অনির্বাণ ঘুরে ঘুরে শিশুদের ছবিগুলো দেখছিলো । কেউ আঁকছে তার স্বপ্নের পৃথিবী, কেউ বা আঁকছিলো বন্ধুর বেশে থাকা গাছের ছবি । কেউ বা আঁকছিলো শুয়ে থাকা ঘুমন্ত শিশুর মাথায় হাত বুলানো মাতৃরূপী গাছের ছবি । অনির্বাণের সত্যি সত্যিই ভালো লাগছিলো সেই পরিবেশ ।
বার্তাবাহকের শেষ আগমন
ঠিক সেই মূহুর্তে আকাশের রঙ বদলে গিয়ে সোনালী হয়ে গেলো । শিশুরা আর তাদের মায়েরা ভয় পেয়ে এক জায়গায় জড়ো হয়ে গেলো । এর মধ্যে ঋষি এসে দাঁড়িয়েছে অনির্বাণের পাশে । অনির্বাণ আর ঋষি নিজেদের পরিচয় দিয়ে তাদের ভয় পেতে বারণ করলো ।
ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগলো বার্তাবাহকদের যানটি । আর তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলো বার্তাবাহকেরা । এবারে যেন তারা আরো অনেক বেশি শাম্ত, সঙ্গে আরো পরিণত । অনির্বাণ মনে মনে হাসলো । সে জানতো, ওরা আসবেই ।
প্রধান বার্তাবাহক দল থেকে এগিয়ে আসে । তার চোখে যেন সন্তুষ্টির ছাপ – “অনির্বাণ আমরা দেখেছি । দশ বছর ধরে দেখেছি । তুমি অনেক পরিশ্রম করেছো, নিজের আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে বদলেছো পৃথিবীকে । তুমি প্রতিশ্রুতি রেখেছো ।“
অনির্বাণ মাথা নোয়ায় আর বলে, “আমি একা করিনি । সবাই মিলে করেছি । আমাদের করতেই হতো ।“
“জানি । আর তাই শেষবারের মতো এলাম তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে । আর তোমাকে উপহার দিতে ।“ বার্তাবাহকের হাতে এসে গেলো একটা ছোট চৌকো স্ফটিক । তার ভেতরে জ্বলজ্বল করছে সাত রঙের উজ্বল আলো ।
বার্তাবাহক আবার বলতে থাকে- “এটি আমাদের তোমাকে দেওয়া উপহার । এর নাম ‘জীবন স্ফটিক’ । পৃথিবীর বুকে যতোদিন ভালোবাসা থাকবে, ততোদিন এটা উজ্জ্বল হয়ে জ্বলবে । কিন্তু সাবধান, এটি নিভতে থাকলে বুঝবে পৃথিবী আবার বিপদে পড়তে চলেছে ।“
অনির্বাণ হাত বাড়িয়ে স্ফটিকটা নিজের হাতে নেয় । আর প্রশ্ন করে, “তোমরা কি চলে যাচ্ছো?”
বার্তাবাহকের কাছ থেকে উত্তর আসে,”হ্যাঁ, আমাদের কাজ শেষ । পৃথিবী এখন নিজের পায়ে দাড়াতে শিখেছে । তবে আমরা দেখবো, সব দেখবো দূর থেকে । প্রয়োজন পড়লে আবার আসবো । কিন্তু আশা করি, সে্ইদিন আর আসবে না, যদি তোমরা ভালোবাসো প্রকৃতিকে-পৃথিবীকে ।“
এই কথা বলে বার্তাবাহক মিলিয়ে যেতে থাকে পেছনে । শেষবারের মতো আকাশে ভেসে ওঠে সোনালী মেঘ । তারপর সব মিলিয়ে যায় ।
নতুন পৃথিবী
আকাশ থেকে নেমে আসে বৃষ্টি । সব যেন নির্মল হয়ে যেতে থাকে সে্ই বৃষ্টির ধারায় । একটি ছোট্ট শিশু এসে অনির্বাণের হাত ধরে, আর জিজ্ঞাসা করে – “দাদু, ওরা কি আবার আসবে?”
অনির্বাণ শিশুটির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় । আর বলে, “আসবে না, যদি আমরা ঠিক থাকি । যদি আমরা গাছেদের বাঁচাই, যদি নদীগুলো পরিষ্কার রাখি, যদি পৃথিবীকে ভালোবাসি তাহলে ওরা আর কখনো আসবে না ।“
ছোট্ট শিশু দৃপ্ত কন্ঠে উত্তর দেয়, “আমরা ভালোবাসবো দাদু । আমি কথা দিচ্ছি ।“
অনির্বাণ শান্তির হাসি হাসে । তার পাশে তখন একদিকে ঋষি দাড়িয়ে, অন্যদিকে সেই শিশু । আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে অনির্বাণ বলে, “শুনতে পাচ্ছো? এই শিশু, এই যুবক কথা দিচ্ছে । তাই পৃথিবী নিরাপদ ।“
বাড়িতে ফিরে সন্ধ্যাবেলায় অনির্বাণ বসে আছে ছাদে একটা সিঁড়ির উপর । হাতে সেই জীবন স্ফটিক । তার সাত রঙের আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে অনির্বাণের মুখ-চোখ । ঋষি তার পাশে এসে বসে, আর বলে, “কাকু, একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?”
“বল ।“
“ওরা কি আসলে সত্যিই ভিনগ্রহের প্রাণী ছিলো, নাকি আমরা নিজেদেরই কোন রূপ দেখলাম ?” অনির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে । তারপর বলে, “হতে পারে আমরা নিজেরাই । হয়তো আমরাই বা আমাদের ভবিষ্যৎ বা আমাদের বিবেক । যে আমাদের বার বার মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী আমাদের ধারক । সে থাকলেই আমরা আছি, নয়তো নয় ।‘
ঋষি বলে ওঠে, তার মানে তুমি বলছো, “ওরা তাহলে এখনো আমাদের মধ্যেই আছে এবং থাকবে ।“ অনির্বাণ উত্তর দেয়, “হ্যাঁ, থাকবে প্রতিটা মানুষের ভেতর । আর তখন তারা জেগে উঠবে যখন সেই মানুষটি একটি গাছ লাগাবে বা গাছের যত্ন নেবে অথবা সে যখন প্লাস্টিককে এড়িয়ে চলবে বা যখন কেউ নদী বাচাতে এগিয়ে আসবে ।“
আরো কিছুক্ষণ কথা বলার পর ঋষি চলে যায় । রাত আরো গভীর হতে থাকে । নিস্তব্ধ রাস্তার আলোগুলো শুধু জ্বলতে থাকে । কিন্তু সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোটা যেন জ্বলতে থাকা অনির্বাণের হাতের ‘জীবন স্ফটিক’ থেকে । অনির্বাণের মনে হতে থাকে সেটাই যেন পৃথিবীর নতুন সূর্য, নতুন আশা ।
রাতের আকাশে মেঘেরা ভেসে বেড়ায় । কেউ জানে না, শুধু অনির্বাণ জানে সেগুলো শুধু মেঘ নয়, সেগুলো চোখ । অনির্বাণ জানে, সেই চোখ দিয়ে তারা দেখছে । আর দেখতে দেখতে তারা হাসছে-শান্তির হাসি, আনন্দের হাসি, সুখের হাসি । কারণ পৃথিবী বেঁচে রয়েছে । ভালোবাসা বেঁচে উঠেছে । মানুষের ভেতরের মানুষটা জেগে উঠেছে ।
(সমাপ্ত)
গল্পের শেষ কথা
প্রিয় পাঠক,
“গল্পের ঝুলি” পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ । “মেঘের বার্তাবাহক” গল্পটি এখানেই শেষ । বার্তাবাহকদের আগমন, অনির্বাণের যাত্রা, পৃথিবী বাচানোর লড়াই – সব কিছুই শেষ হলো এক নতুনের শুরুতে । এই গল্প লেখার উদ্দেশ্য কিন্তু শুধুমাত্র একটি কল্পবিজ্ঞানের গল্প লেখা নয়, বরং বলা যেতে পারে এটি আমাদের ভবিষ্যতের দর্পণ । আমরা আজ যে পৃথিবীতে বাস করছি, সেটি কি আসলে আমাদের বার্তা পাঠাচ্ছে না ? খরা, দাবানল, বন্যা - এগুলো কি এক ধরনের বার্তা নয় ?
হতে পারে আপনিও একজন অনির্বাণ । হয়তো আপনার হাতেও আছে পৃথিবী বাঁচানোর ক্ষমতা । গাছ লাগান, প্লাস্টিক এড়িয়ে চলুন, শিশুদের শেখান পৃথিবী ও প্রকৃতি কি, তাদের মূল্য কি, তাদের ভালোবাসতে শেখান প্রকৃতিকে । আর তাহলেই পৃথিবী বাঁচবে । তাহলেই হয়তো আর কোনদিন বার্তাবাহকদের আসার প্রয়োজন হবে না ।
“গল্পের ঝুলি”তে আবার দেখা হবে আপনাদের সঙ্গে নতুন কোন গল্পে । গল্পটি ভালো লাগলে এবং গল্পের বিষয়বস্তুর গুরুত্ব বুঝতে পারলে শেয়ার করবেন । ততোদিনের জন্য অনুরোধ, পৃথিবীকে আরো একটু ভালোবাসুন । প্রকৃতিকে রক্ষা করুন । আসুন আমরা সবাই অনির্বাণ হই । সবাই মিলে গড়ে তুলি এক নতুন সুন্দর, নির্মল পৃথিবী । সবাই ভালো থাকবেন ।
যদি ভিন্ন স্বাদের গল্প পড়তে চান তাহলে ক্লিক করুন -
# ছোট গল্প # # ভালোবাসার গল্প # # ভৌতিক গল্প # # রহস্য গল্প # # জীবন-অনুভূতির গল্প # # শিক্ষণীয় গল্প #
%20%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%20%E0%A6%95%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9E%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0%20%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA.jpg)
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন