প্রিয় পাঠক, আপনার কি কখনো কারো জন্য বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে? রাতে ঘুম আসে না, ফোনটা হাতে নিয়ে বারবার তার প্রোফাইল দ্যাখেন, কিন্তু মেসেজটা লিখতে পারেন না সংকোচে। আবার কখনো এমন মনে হয়েছে কি যে একটা ভুল বোঝাবুঝি আপনার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে? তাহলে এই গল্পটি আপনার জন্য।

‘অধরা উপলব্ধি’ শুধু একটি গল্প নয়। এটি হাজারো তরুণ-তরুণীর দৈনন্দিন সংগ্রামের আয়না। ইনস্টাগ্রামে শুরু হওয়া টান, স্পটিফাইয়ের প্লেলিস্টে লুকানো ভালোবাসা, আর একটি ভয়েস নোটের জন্য চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া সম্পর্ক। আবার একটি কফি শপে মুখোমুখি দাঁড়ানো, সত্য বেরিয়ে আসা, আর ভাইরাল হওয়া রিলসের কাহিনী। এটি এখনকার সময়ের গল্প। ডিজিটাল যুগের ভালোবাসার গল্প।

তাহলে আর দেরী কেন? চোখের সামনে ভেসে উঠুক মুম্বই-কলকাতার দূরত্ব, মোবাইলের আলোয় জ্বলা রাত, আর নীল ছাতার প্রতিশ্রুতি। পড়তে থাকুন ‘অধরা উপলব্ধি’। শেষ পর্যন্ত পড়ে নিশ্চয়ই নিজেকে খুঁজে পাবেন।

আর হ্যাঁ, গল্পটা পড়ার সময় হয়তো আপনারও মনে পড়বে সেই একজনকে… চুপিচুপি যার ডি.এম খুলে আপনি দ্যাখেন। তবে চুপ করে না থেকে সমস্ত কথা বলে নেবেন, ভুল বোঝাবুঝি যত দ্রুত দূর হয়, ভালোবাসা তত দ্রুত ফিরে আসে।

একটি ভারতীয় সুন্দরী মেয়ের হাতে স্মার্টফোন, পর্দায় “ভাইরাল” লেখা – বাংলা রোমান্টিক ছোট গল্পের ইলাস্ট্রেশন

যখন ভালোবাসা শুরু হয় একটা ডাবল ট্যাপদিয়ে

রাত প্রায় ১টা। মুম্বইয়ের একটি ছোট ফ্ল্যাট। অনন্যা তখনও জেগে। তার হাতে ট্যাবলেট, পাশে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফি। সে পেন্টিং করছে – জলরঙে এক নীল চোখের মেয়ের মুখ। কাজটা প্রায় শেষ। গভীর নিঃশ্বাস ফেলে সে পেন্টিংটা ইনস্টাগ্রামে আপলোড করল। ক্যাপশন দিল, “নীল চোখে লুকানো এক স্বপ্ন।”

তার ফলোয়ার সংখ্যা অত্যন্ত কম, তাই কোনো কমেন্ট আসবে বলে সে আশা করেনি। কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যেই এল একটি নোটিফিকেশন।

@pritom_art : “এই ছবিটা তুমি আমার দেয়াল থেকে চুরি করেছ? ”

অনন্যার ভ্রু কুঁচকালো। ‘চুরি’ শব্দটা তার ভালো লাগেনি। সে ক্লিক করে প্রীতমের প্রোফাইল খুললো। চোখ কপালে উঠল – প্রায় ৫২ হাজার ফলোয়ার। প্রতিটি পোস্ট যেন মুগ্ধ করার মতো। স্টাইলটা আশ্চর্যজনকভাবে তার নিজের মতোই। জলরঙ, নরম আঁচড়, আর প্রতিটি ছবির গভীরে যেন একটা গল্প।

সে রিপ্লাই দিল ডিএম-এ : “আমি চুরি করি না। এটা আমার নিজের আঁকা। আর তুমি কে?”

উত্তর এল পাঁচ মিনিটের মধ্যেই : “প্রীতম। কলকাতার শিল্পী। আর তুমি?”

“অনন্যা। মুম্বই।”

“তাহলে বুঝলাম, আমাদের স্টাইল মিলে যাওয়াটা নেহাতই কাকতালীয়। কিন্তু তুমিও কি রাত জেগে আঁকো?”

“প্রতিদিন।”

“তারমানে তুমিও একা থাকো?”

অনন্যা একটু থমকে গেলো। একজন অচেনা মানুষকে এত সহজে নিজের কথা বলা ঠিক নয়। কিন্তু তবু উত্তর দিলো : “হ্যাঁ। আর তুমি?”

“আমিও। ছবি আর ফোন – এই দুই-ই আমার সঙ্গী।”

এই ছিল তাদের প্রথম কথোপকথন। সেদিন রাত সাড়ে তিনটা পর্যন্ত তারা গল্প করেছিলো। প্রথমে আর্ট, তারপর সিনেমা, তারপর একসময় খোলাখুলি নিজেদের ভাঙা ঘর, নিঃসঙ্গতা আর স্বপ্নের কথা।

ডি.এম থেকে ডুয়েট ভালোবাসার ধাপগুলো

প্রথম সপ্তাহে তারা দিনে কয়েকবার মেসেজ করতো। দ্বিতীয় সপ্তাহে এল ভয়েস নোট। অনন্যা প্রথম ভয়েস নোট শুনে চমকে গিয়েছিল – প্রীতমের কণ্ঠ এত মেলোডিক, এত গম্ভীর। শুনলে মনে হতো যেন কেউ কানে কানে কবিতা শোনাচ্ছে।

তৃতীয় সপ্তাহে ভিডিয়ো কল। প্রথমবার যখন প্রীতমের মুখ দেখলো, অনন্যার হাত কেঁপে উঠলো। লম্বা, কিছুটা এলোমেলো চুল, চোখে ঘুমের আভা, কিন্তু হাসিটা এত আন্তরিক।

“তুই তো দারুণ সুন্দর রে !” প্রীতমের প্রথম কথাই ছিল এটা।

অনন্যা লজ্জায় স্ক্রিনের দিকে তাকাতে পারেনি। “থাম ! এভাবে বললে আর কথা বলতে পারবো না।”

“তো কথা না বলেই থাকি? তাহলে আঁকা শুরু করি একসঙ্গে?” প্রীতম প্রস্তাব দিলো।

সেই থেকে তাদের রুটিন বদলে গেলো। প্রতি রাত ১১টায় ভিডিয়ো কল। একই সময়ে তারা আঁকতো। কখনো একই বিষয়, কখনো আলাদা। তারপর শেষে দেখাতো একে অপরকে। সেই রাতগুলো ছিলো যেন জাদুর রাত।

একদিন প্রীতম পাঠাল স্পটিফাই প্লেলিস্ট। নাম দিল “অনন্যার জন্য সৃষ্টি”। সেখানে ছিল কফির দোকানের জ্যাজ থেকে শুরু মেলোডিয়াস লো-ফাই বিটস।

“শোন, তুই আঁকার সময় এই গানগুলো শুনলে তোর ছবিতে এক অন্য মাত্রা চলে আসবে,” সে বললো।

অনন্যা সত্যিই শুনলো। আর সত্যিই বদলে গেল তার আঁকার ধরন। প্রতিটি ব্রাশস্ট্রোকে যেন প্রীতমের ছোঁয়া।

এক মাস পর প্রীতম বললো, “আমি তোকে ভালোবাসি। বলতে এতদিন লাগলো কেন জানি না।”

অনন্যার চোখ ভিজে গেলো। “আমিও। কিন্তু দূরত্ব...”

“দূরত্ব বাধা নয়। অপেক্ষা বাধা হতে পারে। আমি অপেক্ষা করবো। তুই করবি?”

“অপেক্ষা তো করছিই।”

এই ছিল তাদের প্রেমের ঘোষণা। কোনো ফুল ছিলো না, কোনো মোমবাতি ছিলো না। ছিলো শুধু দুটি ফোনের স্ক্রিন আর দুটি কাঁপা কণ্ঠ।

কালো মেঘের আগমন যে ভয়েস নোটে লুকিয়ে ছিল বিষ

তারপরের দিনগুলো স্বর্গের মতো কাটছিলো। কিন্তু স্বর্গেও বোধহয় মাঝে মাঝে বজ্রপাত হয়।

এক বুধবার সকাল। অনন্যা ঘুম থেকে উঠে ফোন চেক করতে গিয়ে দেখে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ফরোয়ার্ড করা ভয়েস নোট। প্রেরকের নাম – সৌরভ। প্রীতমের ‘বন্ধু’ (যাকে প্রীতম প্রায়ই বদনাম করতো)। ফরোয়ার্ড করার ট্যাগ ছিল : “দেখ, তোর প্রীতম আসলে তোকে নিয়ে কী ভাবে।”

অনন্যা কান দিয়ে শুনলো। তাতে প্রীতমের মতোই এক কণ্ঠ, কিন্তু কথাগুলো পাথরের মতো কঠিন :

“হ্যাঁ রে, অনন্যা তো শুধু এক্সপেরিমেন্ট ছিলো। সময় কাটানোর জন্য কথা বলতাম। আসলে আমার গার্লফ্রেন্ড আছে – ঐশি। ওর সঙ্গেই আমার ভবিষ্যৎ। অনন্যা যা ভাবছে, তা আসলে কিছুই না।”

অনন্যা প্রথমে অবিশ্বাস করলো। এটা প্রীতমের কথা নিশ্চয় নয়। কিন্তু কন্ঠের এত মিল! আর সৌরভ তো তার ‘বন্ধু’, সে মিথ্যা কথা বলবে কেন?

সে বারবার ভয়েস নোটটা শুনলো। বারবার। প্রতিবার যেন ছুরি চললো তার বুকে। শেষবার পর্যন্ত শুনে সিদ্ধান্ত নিল – প্রীতমকে ফোন করবে। একবার তার কথা শুনবে সরাসরি।

ডায়াল করল। রিং হলো। কেউ ধরলো না। আবার। আবার। চারবার কল করার পরও রিসিভ করলো না। সে টেক্সট করলো : “প্রীতম, ভয়েস নোটটা শুনেছি। সত্যিটা কি বলো।”

কোন উত্তর এলো না।

এক ঘণ্টা পর অনন্যা আরেকটি টেক্সট করলো : “তোমার ঐশিকে শুভ কামনা। আমি ব্লক করছি। আর কখনো যোগাযোগ করবে না।”

সে সত্যিই ব্লক করলো। প্রীতমের নম্বর, ইনস্টাগ্রাম আইডি, স্পটিফাই – সব জায়গা থেকে বের করে দিলো। তারপর সারা দিন বিছানায় পড়ে রইলো। কাঁদতে ইচ্ছে করছিলো না। ভেতরটা শুধু শূন্য হয়ে যাচ্ছিলো অনন্যার ।

অন্যদিকে, প্রীতম তখন মুর্শিদাবাদে একটি আর্ট ক্যাম্পে ছিল। তিন দিনের জন্য ফোন টেবিলে রেখে বেরিয়েছিলো। ফেরার পর ফোন হাতে নিয়ে দেখে অনন্যার থ্রেটেড মেসেজ। সে বারবার কল করার চেষ্টা করলো – কিন্তু নম্বর চেঞ্জড। সে ইনস্টাগ্রাম খুললো – আইডি ডি-অ্যাকটিভেটেড।

প্রীতম তখন পাগলের মতো সৌরভকে ফোন করলো। “তুই কী করলি রে?”

সৌরভ নির্দোষ সেজে বলল, “আমি আবার কী করবো? তাকে তো আমি কিছু বলিনি।”

প্রীতম বুঝতেও পারলো না কী হয়েছে। শুধু জানত, তার ভালোবাসা হারিয়ে যাচ্ছে নিমেষে।

ছয় মাস দূরত্ব নয়, যন্ত্রণা

প্রথম মাস। অনন্যা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে। সকালে অফিস, রাতে আঁকা। কিন্তু আঁকা হয়ে ওঠে কালো-সাদা। রঙ হারিয়ে ফেলে। বন্ধুরা বলে, “অনু, তোর ছবিতে আনন্দ নেই।” অনন্যা হেসে উড়িয়ে দেয়।

দ্বিতীয় মাস। সে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফিরে আসে কিন্তু ভিন্ন নামে। ফলো করে না কাউকে। শুধু আর্ট পেজ চালায়। রাতে ঘুম আসে না। স্পটিফাই খুলে দেখে সেই প্লেলিস্ট ‘অনন্যার জন্য সৃষ্টি’ – কিন্তু ব্লক করায় আর চালানো যায় না। তবু মন দিয়ে দেখে – প্রীতম তখনো প্লেলিস্ট ডিলিট করেনি। ‘কেন?’ ভাবলেই তার বুকটা শুন্য হয়ে যায়, মনে হয় এখুনি ফেটে জলোচ্ছ্বাস বেরিয়ে পড়বে । বুক থেকে গলা অবধি কান্নাটা যেন দলা পাকিয়ে আটকে যায়।

তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ মাস। অনন্যা নিজেকে ব্যস্ত রাখে। নতুন প্রোজেক্ট, নতুন বন্ধু, নতুন রুটিন। কিন্তু তার ভেতরের শূন্যতা ঘোচে না। রাতে ঘুমের আগে একবার মনে হয় – ‘যদি প্রীতমের ভয়েস নোটটা নকল হয়? যদি সৌরভ কোন যড়যন্ত্র করে?’

কিন্তু সে তার দম্ভ ছাড়ে না। “যে এক্সপেরিমেন্ট বলে, তাকে ফিরে পেতেও চাই না,” বলে নিজেকে বোঝায়।

অন্যদিকে প্রীতম প্রতিদিন চেষ্টা করে অনন্যার নতুন আই.ডি বের করার। ইনস্টাগ্রামে সার্চ করে, ‘অনন্যা আর্ট’ টাইপ করে – হাজারো প্রোফাইল খুজে পায়, কিন্তু কোনোটা তার অনন্যার নয়। একদিন সে ফোন নাম্বার চেঞ্জ করে একটি মেসেজ লেখে – ‘অনন্যা, আমি নিরপরাধ’ – কিন্তু পাঠানোর সাহস পায় না।

সৌরভ তখন প্রীতমকে বোঝাতে থাকে , “ভুলে যা ওকে। মেয়েরা এমনই হয়।” কিন্তু প্রীতমের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে।

মাঝেমধ্যে সে অনন্যার পুরনো ফটো দেখে। আর সেই ছবিটা – প্রথম পেন্টিং, যার কমেন্টে তাদের দেখা। সেটা এখনো অনন্যার প্রোফাইলে আছে। ডিলিট করেনি। কেন?

কাকতালীয় নয়, নিয়তি কফি শপের সেই বিকেল

ছয় মাস পর। অক্টোবরের মেঘলা এক বিকেল। অফিসিয়াল কাজে অনন্যা কলকাতায় এসেছে। তার ফ্লাইট সকালে নেমেছে । কাজকর্ম মিটিয়ে দুপুরের দিকে হালকা খিদে পেতে গুগল ম্যাপ খুলে সে খুজে পেলো কাছের একটা কফি শপ – ‘ব্লু টোকাই’। নামটা মিষ্টি।

অনন্যা এসে কফিশপে ঢুকলো। অর্ডার দিতে গিয়ে বললো, “আমেরিকানো, এক্সট্রা শট, নো সুগার।”

পেছন থেকে কেউ বললো, “আমেরিকানো? এটা তো মুম্বইয়ের মেয়েদের পছন্দের ড্রিংক। কলকাতায় সবাই চা খায়।”

অনন্যা ঘুরে দাঁড়ালো। চোখ কপালে। তিন ফুট দূরত্বে – প্রীতম। তার চুল একটু বড় হয়েছে, দাড়ি এসেছে, চোখে গভীর দাগ। তার হাতে একটি স্কেচবুক, পকেট থেকে বেরিয়ে আছে ইয়ারফোন।

প্রথম কয়েক সেকেন্ডে কিছুই বলতে পারেনি অনন্যা। তার মুখ দিয়ে শুধু বেরোল, “তুই?”

প্রীতমের চোখ বিস্ফারিত। “অনন্যা? তুই? এখানে?”

“অফিসের কাজে এসেছি। তুই কেন এখানে?”

“এটা আমার নিয়মিত জায়গা। আঁকতে আসি।” প্রীতম এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠ কাঁপছে। “শোন, এক মিনিট সময় দে। ওই ভয়েস নোট...”

অনন্যা হাত তুলে থামালো। “প্লিজ, না। আমি সেই যন্ত্রণা আর নিতে চাই না। তুই যদি ‘এক্সপেরিমেন্ট’ বলেই ভাবতিস, তো বল। আমি মেনে নেবো।”

“এক্সপেরিমেন্ট? আমি? তোকে?” প্রীতমের চোখ লাল। “সেটা সৌরভের পাতা ফাঁদ ছিল। তুই বিশ্বাস কি করে করলি ? আমাকে একবার জিজ্ঞেস করলি না?”

“তোকে কল করেছিলাম! চারবার কল করলাম! তুই রিসিভ করলি না!”

“আমি আর্ট ক্যাম্পে ছিলাম। ফোন টেবিলে রেখে গিয়েছিলাম। সৌরভ সেটা জানতো। সেইজন্যই সেই সময়ে তোর জন্য ফাঁদ পেতেছিলো।”

অনন্যা নিজের ভেতর একটা কিছু যেন ভাঙার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলো। সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। পাশের চেয়ারে বসে পড়লো। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।

“তাহলে সব মিথ্যে? ওই ভয়েস নোট?”

“এডিটেড। সৌরভ আমার কণ্ঠ রেকর্ড করে এডিট করেছিলো। তুই চাইলে এক্ষুনি অডিও ফরেনসিক করে দেখতে পারিস।”

নাটকীয় মোড় সৌরভের আগমন

অনন্যা তখনো কিছু কথা বলতে পারছে না । হঠাৎ কফি শপের দরজা খুলে ঢুকল সৌরভ। তার সঙ্গে এক মেয়ে – সম্ভবত নতুন ডেট। সৌরভ প্রীতম ও অনন্যাকে দেখে থমকে গেলো। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে ।

প্রীতম কোনরকম চেঁচামেচি করে না। বরং শান্ত গলায় কিন্তু দৃঢ় স্বরে বললো, “সৌরভ,আজ আর তোর পালানোর কোন সুযোগ নেই, সুতরাং তুই স্বীকার করে নে তুই কী করেছিলিস? তুই তো জানতিস, আমি অনন্যাকে ভালোবাসি।”

সৌরভ ঘুরে পালাতে চাইলো। কিন্তু দারোয়ান কিছু একটা ঝামেলা হতে পেরে আন্দাজ করে দরজা বন্ধ করে দিতে সে ফিরে এলো। সৌরভের সঙ্গের মেয়েটি থমকে দাঁড়াল, “এসব কী হচ্ছে?”

অনন্যা দাঁড়িয়ে পড়েছে । তার গলায় এখন আর কোনো কান্না নেই, রয়েছে আগুন। “সৌরভ, আমি রেকর্ডিং করছি। তুই যা বলবি, তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হবে। এখন বল, সেই ভয়েস নোট তুই কেন বানিয়েছিলি?”

সৌরভ বুঝতে পারলো পিছু হটার কোন জায়গা নেই, পালানোর কোন সুযোগ নেই । তার হাত-পা  কাঁপছে। “হ্যাঁ, আমিই বানিয়েছিলাম। কারণ প্রীতম সব সময় আমার চেয়ে ভালো ছবি আঁকতো। সবাই তাকে নিয়ে পড়ে থাকতো, তার প্রশংসা করতো। আমি চেয়েছিলাম সে যেন ভেঙে পড়ে। কিন্তু তোমাদের ভালোবাসা এত শক্তিশালী হবে ভাবিনি।”

প্রীতমের চোখে জল। সৌরভের দিকে তাকিয়ে বললো, “তুই আমার বন্ধু ছিলিস। শুধুমাত্র হিংসা, তার জন্য তুই বিশ্বাসঘাতকতা করলি। আজ থেকে তুই আমার জীবনে নেই।”

সৌরভের সঙ্গে আসা মেয়েটি থুথু ফেলে তাকে ছেড়ে চলে গেলো। সৌরভ মুখ ঢেকে বসে পড়লো একটা চেয়ারে ।

রাতের ছাদ আর সেই রিং – বাংলা রোমান্টিক ছোট গল্প ‘অধরা উপলব্ধি’র ক্লাইম্যাক্স ইলাস্ট্রেশন

ভাইরাল সেই রিলস প্রমাণের পাহাড়

অনন্যার ফোন পুরো ঘটনার অডিয়ো রেকর্ড করছিল। সৌরভের স্বীকারোক্তি স্পষ্ট। সে কফি শপের ভেতরেই দাঁড়িয়ে একটি ৩০ সেকেন্ডের রিলস বানালো। প্রথমে সৌরভের ‘আমি ভয়েস নোট বানিয়েছিলাম’ অংশটি নিলো, তারপর প্রীতমের কণ্ঠে ‘আমি অনন্যাকে ভালোবাসি’ অংশটি। আর ক্যাপশন দিল :

“এই ভয়েস নোটের জ্বালায় প্রায় হারিয়েছিলাম ভালোবাসা। আজ সত্যি বেরিয়ে এসেছে। প্রীতম, আমি তোমাকে ফিরে পেলাম। সৌরভ, তুমি আজ থেকে সব শিল্পীর শত্রু। ট্যাগ করুন সেই সব বন্ধুকে যারা সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়।”

পোস্ট দেওয়ার আধ ঘণ্টায় ভিউ ৫০ হাজার। এক ঘণ্টায় শেয়ার ২০ হাজার। তিন ঘণ্টায় #অধরা_উপলব্ধি ট্রেন্ডিং টপিকে চলে যায় কলকাতায়। 

মানুষ মন্তব্য করতে থাকে :

- “এটা সিনেমার চেয়েও নাটকীয়!”

- “বন্ধু মানে বিশ্বাসের, কিন্তু সৌরভ তো সাপ!”

- “অনন্যা, তুমি জিন্দাবাদ। টাইমলাইনে সত্যিকারের প্রেম দেখিয়েছেন!”

সৌরভ তার সব সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে বাধ্য হয়। প্রীতম আবার ইনস্টাগ্রামে অ্যাক্টিভ হয় – তার ফলোয়ার বেড়ে যায় ২ লাখ।

ক্লাইম্যাক্স  রাতের ছাদ আর সেই রিং

সন্ধ্যায় প্রীতম অনন্যাকে নিয়ে গেল তার স্টুডিয়োর ছাদে। নীচে কলকাতার রাস্তার লাইট। এক পাশে হাওড়া ব্রিজের ঝলমল দৃশ্য । অন্যপাশে তারারা নির্বাক হয়ে দেখছে । তাদের মাঝে দুটি কফির কাপ আর একটি ছোট্ট বাক্স।

“আজ থেকে শুরু আমাদের নতুন গল্প,” প্রীতম বললো।

“পুরনোটা কি বাদ যাবে?” অনন্যা জিজ্ঞেস করলো।

“না। পুরনোটা আমাদের জীবনের অতীত অধ্যায়। আর নতুনটা হবে সুন্দর।”

প্রীতম বাক্স খুললো। ভেতরে একটি রূপালি রিং। তার ওপর খোদাই করা : # অধরা_উপলব্ধি

“এটা বাগদানের রিং নয়। এটা প্রতিশ্রুতির রিং। আমি কখনো তোর কাছে কোন সত্য গোপন করব না। আর তুই? তুই কখনো সন্দেহ করবি না তো ?”

অনন্যা রিংটা হাতে নিল। তার চোখে তখন জল। কিন্তু এবার সেই জল তিক্ত নয়, মিষ্টি।

“আমি সন্দেহ করবো? যে মানুষটা ছয় মাস ধরে আমার জন্য প্লে-লিস্ট মুছে দেয়নি, তাকে সন্দেহ করবো? কীসের জ্বালায়!”

প্রীতম হেসে উঠলো। তারপর কাছে এসে অনন্যার কপালে চুমু দিলো। বাতাসে ভেসে এল নিচের রাস্তার ট্রাফিকের শব্দ, কিন্তু তাদের কানে বাজছিলো শুধু নিজেদের হৃদয় ছন্দ।

“গান শুনবি?” প্রীতম ফোন বার করলো।

“আমার পুরনো প্লেলিস্ট?”

“না। নতুন। নাম দিয়েছি ‘অধরা উপলব্ধি – আবার’। সেখানে আছে সেই সব গান, যেগুলো ছয় মাস ধরে শুনতে পাইনি। এখন শুনবি?”

অনন্যা মাথা নেড়ে রাজি হলো। প্রীতম স্পটিফাই চালু করলো। প্রথম গান বাজতেই অনন্যা হঠাৎ থামিয়ে দিলো।

“এটা আমার আপলোড করা গান। তুই কিভাবে পেলি? আমি তো তোকে ব্লক করেছিলাম!”

“তুই ব্লক করলি, কিন্তু আমি আরেকটা আইডি বানিয়ে তোর পাবলিক প্লেলিস্ট ফলো করেছিলাম। তোর গান শুনতাম প্রতিদিন। কাঁদতাম। কিন্তু কিচ্ছু বলতে পারতাম না।”

এই বলে প্রীতম নিজেও চুপ করলো। তারা দুজন অনেকক্ষণ শুধু গান শুনলো। চারপাশের শহর যেন তাদের সঙ্গী।

ভালোবাসার নতুন সংজ্ঞা ....

রাত প্রায় ১০টায় অনন্যা জানালো, “কাল আমার ফ্লাইট-মুম্বই।” আমায় এবার হোটেলে ফিরতে হবে ।

“থাকবি না?” প্রীতম বিষণ্ণ।

“থাকতে পারবো না। কাজ আছে। কিন্তু এবার দূরত্ব কমিয়ে দিচ্ছি। কলকাতায় নিজের অফিস খুলবো। ছয় মাসের মধ্যেই শিফট করছি।”

প্রীতম অবাক। “সত্যি?”

“হ্যাঁ। সত্যিই । এবার আর অপেক্ষা নয়। ভালোবাসলে মানুষ পাশে থাকে। দূরত্ব যতই হোক।”

পরদিন বিমানবন্দরে প্রীতম অনন্যাকে বিদায় দিতে এলো। হাতে একটি নীল রঙের ছাতা নিয়ে এসেছে ।

“মুম্বইয়ে বৃষ্টি কম হয়। তবু নিয়ে যাও। প্রতিবার বৃষ্টি দেখলে মনে করো, আমি পাশে আছি।”

অনন্যা ছাতাটা বুকে চেপে ধরলো। তারপর চলে গেল বোর্ডিং কিউয়ের দিকে। পেছনে ফিরে তাকালো,– প্রীতম তখনো দাঁড়িয়ে। মুখে হাসি নিয়ে হাত নাড়লো।

সে বিমানে ওঠার আগে ইনস্টাগ্রামে একটি স্টোরি দিল : “হারিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু পথ ভুলতে হয়নি। কারণ ভালোবাসা মানে ‘অধরা উপলব্ধি’ – যা সহজে মেলে না, কিন্তু মিললে আর যায় না।

 

লেখকের বক্তব্য

প্রিয় পাঠক, এই বাংলা রোমান্টিক ছোট গল্প শুধু বিনোদন নয়, বরং এটি শিক্ষা দেয় – টেকনোলজি যেমন সম্পর্ক গড়তে পারে, তেমনি ভাঙাতেও পারে। তবে সত্যিকারের ভালোবাসা সব বাধা টপকে যায়। সৌরভের মতো মানুষ থাকবেই, কিন্তু আপনার প্রীতমকে খুঁজে নিন। আর যদি কখনো ভুল বোঝাবুঝি হয়, তবে ফোনের পর্দায় আটকে না থেকে সামনাসামনি কথা বলুন। কারণ একটা ভয়েস নোট বা মেসেজের চেয়ে চোখের দেখা, মুখোমুখি কথা হওয়া অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।

এই আধুনিক প্রেমের গল্প হয়তো আপনাকে কাঁদিয়েছে বা হাসিয়েছে, নিশ্চয়ই কোনো না কোনো জায়গায় আপনি নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন। গল্পটি শেয়ার করুন আপনার বন্ধুদের সঙ্গে। ট্যাগ করুন তাঁদের, যাঁরা আপনার ‘অধরা উপলব্ধি’।

 

হ্যাশট্যাগস : # বাংলা_রোমান্টিক_ছোট_গল্প # অধরা_উপলব্ধি # প্রীতম_অনন্যা ভাইরাল_গল্প # গল্পের ঝুলি # ভালোবাসার গল্প #

 

 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন