বাংলা প্রেমের গল্প : দার্জিলিঙের পাহাড়ী রাস্তার বাঁকের মতোই অপ্রত্যাশিত ছিল আমাদের গল্পের শুরু। আর আচমকা আসা মেঘ বা কুয়াশায় ঢেকে যাওয়ার মতো এই গল্পের শেষটাও ছিল একইরকম অনিশ্চিত, যেখানে হারিয়ে যাওয়া আর শূন্যতা থেকে তৈরী হয়েছিল এক করুণ-বিয়োগান্তক সুর ।
আমার নাম আকাশ । কলকাতার একঘেয়েমি আর অফিসের নিঃসঙ্গতা কাটাতে একটু স্বস্তি খুঁজতে এসেছিলাম দার্জিলিংয়ে । বুকিং ডট কম-এ খুঁজে পাওয়া একটি ছোট হোমস্টেতে উঠলাম, যার বারান্দা থেকে দেখা যেত কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফে ঢাকা চূড়ো ।
হোমস্টেটি চালাত এক পরিবার । তাদের মেয়ে মৌরাতি, যাকে সবাই মৌ বলে ডাকতো । প্রায় আমারই বয়সী, বছর দু’তিনেকের ছোট হবে, কলেজে পড়ে । প্রথম দিনই চা নিয়ে এসে বললো, “এখানে এসে কিন্তু সবাই কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পায় না, আপনার ভাগ্য ভালো ।”
আমি হেসে জবাব দিলাম, “ভাগ্য বলে কিছু হয় না মৌ, যে সত্যিকারের মন থেকে কিছু খুঁজতে আসে, তাকেই কিছু না কিছু দিয়ে যায় দার্জিলিং।”
সম্পর্ক বদলে যায়
সেই কথোপকথনই হয়ে গেল আমাদের পরিচয়ের সূচনা। মৌ হয়ে গেল আমার অফিসিয়াল-আনঅফিসিয়াল গাইড । সে আমাকে শিখিয়েছিলো কীভাবে চা-বাগানে সদ্য তোলা চা পাতার ঘ্রাণ নিতে হয়, চিনিয়েছিলো স্থানীয় ‘থুপকা’ সূপ আর ‘মোমো’র স্বাদ। আমরা দু’জনে একসঙ্গে দেখতে যেতাম সূর্যোদয়, টাইগার হিলে কাটাতাম বিকেল, আর ম্যাল রোডে হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতাম জীবন নিয়ে।
দিন যায়, দিন আসে ।
আমাদের আলাপচারিতা গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে। আমি তাকে শোনাতাম কলকাতার গল্প, জীবনানন্দ দাশের কবিতা আর আমার ফটোগ্রাফির নেশার কথা । আর সে আমাকে শোনাতো তার সংসারের গল্প, কীভাবে তার বাবা এই হোমস্টে গড়ে তুলেছেন, আর তার ইচ্ছে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে একটি আর্ট-কাফে খোলার, যেখানে শিল্প আর কফি মিলে মিশে একাকার হবে।
একটা সন্ধ্যায়, হঠাৎ করে জোর বৃষ্টি নামল। আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎই মৌ বলল, “আপনি কোলকাতায় ফিরে গেলে এই বারান্দা আবার অনেক ফাঁকা ফাঁকা লাগবে।”
আমি তার দিকে তাকালাম। বৃষ্টিভেজা চুল, আর চোখে এক অদ্ভুত ধরনের বেদনা। কোনো কথা না বলে, আমি তার হাতটি আমার হাতের মধ্যে নিলাম। সেদিন আমরা দুজনেই বুঝতে পেরেছিলাম, আমাদের সম্পর্কটা শুধু গাইড আর পর্যটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
জীবন থেমে থাকে না
কিন্তু জীবন তো আর শুধু ভালোবাসা দিয়ে গড়া নয়। আমার ছুটি ফুরিয়ে এল। আমাকে ফিরে যেতে হবে কোলকাতায়, চাকরির জগতে। চলে যাওয়ার আগের রাতে, আমি তাকে বললাম, “মৌ, তুমি আমার সঙ্গে চলো। আমরা কোলকাতায় থাকব।”
মৌ মাথা নাড়ল। “আকাশ, এটাই আমার ঘর। আমার বাবা-মা, এই হোমস্টেট— ওগুলো সব আমার দায়িত্ব । তুমি কি পারো এখানে থেকে যেতে?”
উত্তরটা আমরা দু’জনেই জানতাম। আমার বাবা-মা, আমার ক্যারিয়ার, আমার সম্পূর্ণ জীবন তো কলকাতায় বাঁধা। পাহাড়ে আমি একজন অস্থায়ী অতিথি মাত্র। আমরা চুপ করে রইলাম । সেই নি:শব্দতা যেন আমাদের সমস্ত ভালোবাসার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ালো ।
যে দিনটায় আমি চলে আসবো, সেদিন স্টেশনে পৌঁছে দিতে এসেছিল মৌ। ট্রেন ছাড়ার আগে, সে আমার হাতে একটি ছোট প্যাকেট দিল। বলল, “রাস্তায় খুলো না, বাড়ি পৌঁছে তারপরে খুলো ।”
ট্রেন যখন শিলিগুড়ি পার হয়ে কলকাতার দিকে এগোচ্ছে, আমি আর কৌতুহল সংবরণ করতে পারলাম না । প্যাকেটটা খুললাম। ভিতরে ছিল একটি হাতে নকশা করা-বাঁধানো অ্যালবাম । আমার আর মৌয়ের একসঙ্গে তোলা সব ফটো সাজানো ছিল তাতে । আর তার শেষ পৃষ্ঠায় লেখা ছিলো : “তুমি দূরে চলে গেলেও, আমার স্মৃতিতে থেকে যাবে চিরকাল ।”
বাস্তব অতি কঠিন
আমরা চেষ্টা করেছিলাম সম্পর্কটা বাঁচিয়ে রাখতে। ফোন, ভিডিও কল... কিন্তু স্ক্রিনের পিক্সেলগুলো কি কখনো হাতের উষ্ণতার প্রতিস্থাপন হতে পারে? আমি তাকে বলতাম কোলকাতার রাস্তার জ্যাম-এর গল্প, সে বলত দার্জিলিং-এ নতুন করে ফোটা চা-গাছের পাতার কথা । আমাদের জগৎ হয়ে উঠছিলো দুটো ভিন্ন গ্রহের মতো।
তারপর একদিন, ফেসবুকে দেখলাম মৌ-এর প্রোফাইল পিকচার বদলেছে। সেখানে সে এক যুবকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে, যে তাদেরই এলাকার এক চা-বাগানের মালিকের ছেলে। পরে ফোনে মৌ নিজেই বলল, “আকাশ, এটাই আমার বাস্তবতা। তুমি আমার একটা সুন্দর স্বপ্ন ছিলে, কিন্তু স্বপ্ন দেখেই তো জীবন চলে না।”
ওই কথাগুলো যেন আমার বুকের ভেতর দিয়ে একটা শাণিত ছুরি চলে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের গল্পটা এখানেই থেমে যাবে । আসলে কেমনভাবে যেন ধরে নিয়েছিলাম, মৌয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা এরকমই থেকে যাবে । কিন্তু বাস্তব কঠোর, আবার মৌ আমায় শিখিয়ে দিয়ে গেলো ।
শুধু আকাশের জন্য
দু’বছর পরে, আবার দার্জিলিং গেলাম । মনে হচ্ছিল যেন নিজেকে শাস্তি দিতেই এসেছি । হোমস্টেটে গিয়ে শুনলাম, মৌরাতির বিয়ে হয়ে গেছে, সে এখন সিলিগুরিতে থাকে। আমি সেই হোমস্টের বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে রইলাম। পাহাড়, মেঘ, সবকিছুই আগের মতো, শুধু অনুপস্থিত একজন মানুষ।
হোমস্টের কাকা-মৌ-এর বাবা, একটি সুন্দর গিফট প্যাকে মোড়া বাক্স আমার হাতে দিয়ে বললেন, “মৌ বলে গিয়েছিলো, তুমি যদি কখনো ফিরে আসো, তাহলে এই জিনিসটা যেন তোমার হাতে দিই ।“
প্যাক খুলে যেটা পেলাম, সেটা ছিল মৌ-য়ের পুরনো স্মার্টফোন । ফোনে গ্যালারি খুলে একটা অডিও ফাইল পেলাম, যার নাম ছিল “আকাশের জন্য”। হেডফোন কানে লাগিয়ে প্লে বাটন চাপতেই কানে ভেসে এল মৌ-য়ের কণ্ঠস্বর... একটা ভয়েস নোট।
ভয়েস নোট শুরু হল :
“হ্যালো আকাশ ... আশা করি তুমি ভালো আছো । যদি তুমি এটি শোনো, তার মানে তুমি আবার ফিরে এসেছ আমাদের দার্জিলিং-এ। জানি না কী লিখব, ভেবেই পাইনি, তাই ভয়েস নোট করে রেখেছি।
আকাশ, তুমি আমার জীবনে এক অন্যরকম অধ্যায় ছিলে। একটা বৃষ্টিভেজা সুন্দর সকালের মতো, যে স্মৃতি এখনও আমাকে শান্তি দেয়। আমাদের ভালোবাসায় কোনো ভুল ছিল না, শুধু সময় আর পরিস্থিতিটাই ছিল আমাদের বিপক্ষে।
তুমি আমাকে কোলকাতায় নিতে চেয়েছিলে, আমি চেয়েছিলাম তোমায় এখানে রেখে দিতে । কিন্তু আমাদের কারও কোন দোষ নেই । তুমি যেমন তোমার পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছ, আমিও তাই করেছি। শুধু... শুধু জানতে ইচ্ছে হয়, তুমি কি এখনও সেই কবিতার বইগুলো পড়ো? ছবি তোলো?
আমি ঠিকই আছি। আমার স্বামী ভালো মানুষ। কিন্তু জানো, এখনও প্রতিটা পাহাড়ি ভাসা মেঘ, প্রতিটি চা-বাগানের সুরভী আমাকে তোমার কথা মনে করিয়ে দেয়। এটা আমার দুর্বলতা, আমি তা মানতে চাই।
পরের বার যখন দার্জিলিং আসবে, তোমার স্ত্রীকে নিয়ে আসবে... তাকে একজন বাঙ্গালী লোকের কথা বলবে যে একবার এখানে এসে প্রেমে পড়েছিলো... এবং হেরে গিয়েছিল । বিদায় আকাশ... চিরদিনের জন্য নয়, শুধু এই জীবনের জন্য।”
ভয়েস নোট শেষ
একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে, ফোনটি হাতে নিয়ে, আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। চোখে কোনও জল ছিল না, ছিল শুধু এক গভীর, নিঃশব্দ গ্রহণযোগ্যতা। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমাদের গল্পের কোনও নাটকীয় সমাপ্তি নেই, আছে শুধু একটি নিস্তব্ধ বিদায়, একটি ভয়েস নোটের মধ্যে চিরকালের জন্য বন্দী হয়ে থাকাই এর ভবিতব্য ছিলো ।
দার্জিলিঙে পাহাড় এখনও দাঁড়িয়ে আছে, দাঁড়িয়ে থাকবে । মেঘেরা এখনও খেলা করে, খেলা করবে । শুধু একটি অসমাপ্ত প্রেমের গল্প চিরকালের মতো হারিয়ে গেলো দার্জিলিং-এর কুয়াশাঘেরা পাহাড় আর চা-বাগানের সুবাসের মধ্যে । আমাদের জীবন যেন দুটি সমান্তরাল পাহাড়ী পথের মতো যা কোথাও একটি সুন্দর দৃষ্টিকোণে সংক্ষিপ্তভাবে ছেদ করে এবং তারপর, আমাদের নিজস্ব ভাগ্য অনুসরণ করে, এমন এক দূরবর্তী স্থানে প্রসারিত হয় যেখানে আমরা আর কখনও দেখা করতে পারি না.....
পড়ুন এক অসাধারণ ভালোবাসার গল্প : অঙ্গীকার
এই গল্পটি আপনার কেমন লাগলো? নিচে কমেন্টে জানান। আপনার নিজের জীবনের কোনও না বলা গল্প আছে কি? আমাদের জানান, আমরা চেষ্টা করবো আপনার গল্প শেয়ার করার । অরো ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের গল্প পড়ার জন্য ক্লিক করুন – “গল্পের ঝুলি”তে । আর যদি এই গল্পটি পড়ে ভালো লাগে তাহলে সোশ্যাল মিডিয়া এবং আপনার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের শেয়ার করুন ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন