মানবিকতার গল্প : এক সন্ধ্যায় ঝিরঝিরে বৃষ্টির বিকালে অপ্রত্যাশিত ভাবে আয়েষার দরজায় এসে বেল বাজায় এক অচেনা কিশোরী । শুরু হয় এক নতুন মানবিকতার গল্প । যার হৃদয়ছোঁয়া রেশ থেকে যায় অনেক বৃহৎ পরিসরে । যেখানে লেখা হয় মানবিকতা আর সাহসের নতুন জীবনগান । আসুন পড়ি, মৌলিক বাংলা মানবিক গল্প – অতিথি ।
মানবিকতার গল্প – অতিথি | গল্পের ঝুলি
এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়....
সন্ধে নামার ঠিক আগে বিকালের শেষ প্রান্তে্ একটানা ঝিরঝিরে বৃষ্টির শব্দে পুরো বাড়িটা যেন ডুবে ছিলো বিষণ্ণতায় । বিকালের আলো মেঘে ঢাকা আকাশে বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে গিয়ে যেন তৈরী করছিলো এক ম্লান সুর । আয়েষা রান্নাঘরের জানলার পাশে দাড়িয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিলো আনমনে । তার হাতে এক কাপ গরম চা, যা থেকে উঠে আসা ভাপ আয়েষার মুখের সামনে ভেসে ভেসে তৈরী করছিলো এক স্বপ্নিল ছবি । এই নির্জন বিকালে চায়ের আমেজটা যেন আয়েষার মাথায় যেন চড়ে বসেছিলো । একাকীত্ব কখনো কখনো এমনই সঙ্গী হয়, যা শব্দ করে না কিন্তু নিজের উপস্থিতি এমন দিনগুলোয় বারবার জানান দিয়ে যায় ।
ঠিক সেই সময় দরজার বেলটা বেজে উঠলো কর্কশ শব্দে ।
আয়েষার ঘোর লাগা অবস্থাটা ডোরবেলের শব্দে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো ।
আয়েষা চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকালো । কে আসতে পারে এই সময় ? বিকেল পাঁচটায়, এই বৃষ্টির মধ্যে? তার কাছে তো কোন ভিজিটর আসার কথা নয় । জীবনে অনেক লড়াই করে একা একজন মেয়ে হিসাবে সে এই বাড়িটা কিনেছে । যে ক’জন বন্ধু-বান্ধব আছে তাদের সঙ্গে বেশিরভাগ কথাবার্তা হয় ফোনেই বা কর্মক্ষেত্রে বা বাইরে । প্রতিবেশীরা বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা তার কাছে কেউ আসে না । সন্দেহ জাগলো আয়েষার মনে । নিরাপত্তার হিসাব বলে, অচেনা কারো ক্ষেত্রে হঠাৎ দরজা খুলতে নেই, বিশেষ করে আয়েষার মতো একজন একা থাকা নারীর জন্যে সেই নিয়ম আরো কঠোর ।
বেলটা আবার বেজে উঠলো – এবার একটু বেশি সময় । মানে বাইরে যে এসেছে সে একটু বেশিক্ষণ চেপে ধরেছিলো ।
“কে”? আয়েষা দরজার ভেতর থেকে জানতে চাইলো ।
কোন উত্তর এলো না ।
আয়েষা দরজার আইহোলের মধ্যে দিয়ে বাইরে দেখার চেষ্টা করলো । বৃষ্টির ঝাপটায় ঝাপসা হয়ে যাওয়া আইহোলের মধ্যে দিয়ে যা দেখা যাচ্ছিলো, তাতে মনে হলো বৃষ্টিতে ভেজা কাপড়-চোপড়ে একজন দাঁড়িয়ে আছে । আকারে মনে হলো, একজন কিশোর বা কিশোরী হবে ।
“কে তুমি ? কি চাই?” আবার একবার ডাকলো আয়েষা ।
এবারে উত্তর এলো, “দয়া করে ...... একবারটি দরজা খুলুন । এই বৃষ্টিতে একটু আশ্রয় চাই।“ কন্ঠস্বরটি একজন কিশোরীর, ঠান্ডায় আর বোধহয় ভয়ে একটু কাঁপা-কাঁপা ।
আয়েষার মনে নানা দ্বন্দ্ব শুরু হলো । তার মাথায় ভেসে উঠতে লাগলো টি.ভি, মোবাইল আর খবরের কাগজের নানা খবরের বিষয় – প্রতারণা, ছিনতাই ইত্যাদি আরো নানা রকমের বিপদের কথা । কিন্তু সেইসঙ্গে ভেসে এলো আরও এক স্মৃতি । কলেজের শেষে হঠাৎ এক রাতে তার ভাড়াবাড়িতে একইভাবে আশ্রয় চেয়েছিলো তার কলেজের বান্ধবী সীমা । কিন্তু সেদিন আয়েষা অস্বীকার করেছিলো তাকে আশ্রয় দিতে, দরজাও খোলেনি । পরে শুনেছিলো সেই রাতটা নাকি সীমা পার্কে কাটিয়েছিলো । তার পরের দিন থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি । সেই অপরাধবোধ আজও আয়েষার বুকে জ্বালা ধরায় ।
দরজার চেন লাগিয়ে দরজাটা একটু ফাঁক করলো আয়েষা ।
বাইরে দাড়িয়ে ছিলো একজন কিশোরী, বয়স ষোল কি সতেরো হবে । তার সারা শরীর ভিজে কাপড়ে লেপটে রয়েছে, চুলের গোছা থেকে টপটপ করে জল ঝরছে । চোখ দুটো বড় বড়, হয়তো আতঙ্ক আর আশার মিশেলে আরো বড় লাগছে । তার হাতে একটা ছোট কাপড়ের ভিজে ব্যাগ ।
“কে তুমি ? একা এখানে ?” জিজ্ঞাসা করে আয়েষা ।
“আমি .... আমি রিমি ।“ কিশোরীর কন্ঠে ভয় স্পষ্ট । “বৃষ্টিতে ভিজে গেছি । কিছুক্ষণের জন্য একটু আশ্রয় চাইছি ।“
বাইরে তখন মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছে, বাতাসে শিরশিরানি ঠান্ডা । কি মনে করে আয়েষা দরজার চেন খুলে দিলো, “ভেতরে আসো, ঠান্ডা লাগবে।“
রিমি আস্তে আস্তে ভেতরে ঢুকলো আর আয়েষা দরজা বন্ধ করে দিলো । তারপরে সে রিমিকে নিয়ে বসার ঘরে সোফাটা দেখিয়ে বসতে বললো । মেয়েটি সোফার কোণে বসতেই কাপতে শুরু করলো, ঠান্ডায় না ভয়ে – আয়েষা ঠিক বুঝতে পারলো না ।
“একটু বসো, আমি তোমার জন্য তোয়ালে নিয়ে আসি”, বলে উঠে ভেতরে গেলো আয়েষা । আর একটু বাদেই একটা শুকনো তোয়ালে আর কিছু গরম কাপড় নিয়ে এসে মেয়েটিকে দিয়ে বললো, “যাও, পাশের বাথরুমে গিয়ে একটু চেঞ্জ করে এসো” বলে আঙুল দিয়ে পাশের অ্যাটাচড বাথরুমটা দেখিয়ে দিলো । মেয়েটি কিছু না বলে চুপচাপ গরম কাপড় আর তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে চলে গেলো ।
মেয়েটি যখন বাথরুম থেকে বেরোলো দেখলো আয়েষা দু’কাপ আর গরম চা আর কিছু বিস্কুট নিয়ে বসেছিলো । রিমি তখনো অল্প অল্প কাঁপছিলো । আয়েষা তাকে বললো, “বসো, বসে গরম চা-টা খেয়ে নাও, দেখো ঠান্ডাটা একটু কম লাগবে।“ গরম চা টা খেতে খেতে এবার রিমির কাহিনীটা বেরিয়ে আসলো ।
জীবনের কাহিনী
"আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি," বলল রিমি, চায়ের কাপ হাতে নিয়ে । "বাড়ি... আমার বাড়ির কথা এখন বলতে ইচ্ছে করছে না । কিন্তু সত্যি বলতে কি আপনার মধ্যে আমি একটা বিশ্বাসের ছায়া দেখতে পেলাম, তাই বললাম । কিন্তু আপনি আমাকে তাড়িয়ে দেবেন না তো?”
আয়েষা যথাসম্ভব নরম গলায় বললো, “প্রথমে বলো তুমি কে? তোমার সমস্যা কি?”
রিমির গল্পটা অনেকটাই পরিচিত মনে হচ্ছিলো আয়েষার । তার মায়ের মৃত্যুর পরে তার বাবা আবার বিয়ে করেন । তার নতুন মা প্রথমদিকে ভালোই ছিলেন, কিন্তু তার নিজের একটি সন্তান হওয়ার পর থেকেই সব বদলে যেতে থাকে । রিমি ধীরে ধীরে তার চোখের শূল হয়ে ওঠে । রিমির নতুন মায়ের এখন দুই সন্তান – একটি ছেলে ও একটি মেয়ে । তার ভাই-বোনের সঙ্গে কখনোই তার ভালো সম্পর্ক তৈরী হয়নি বা বলা ভালো তার নতুন মা করতে দেননি । তার অত্যাচার দিনকে দিন বাড়তে থাকে । বেশিরভাগ দিনই তার নতুন মা তাকে স্কুলে যেতে দেন না, পড়তে বসতে দেন না । সংসারের বিভিন্ন কাজ তাকে দিয়ে করান ।
“আজ সকালে”, রিমি বলতে লাগলো, তার চোখে জল চলে আসছিলো, “তিনি আমার ডায়েরী খুলে পড়ছিলেন । আমার ব্যক্তিগত ডায়েরী, যেটা আমার মা আমায় আমার মা জন্মদিনে দিয়েছিলেন ।“ আমি যখন বারণ করলাম, তখন নতুন মা বললেন, “এই বাড়িতে তোমার জন্য কিছুই ব্যক্তিগত নেই । তুমি তোমার বাবা-মায়ের জন্য একটি বোঝা ।“ বাবা কিছুই বললেন না, শুধু মাথা নীচু করে দাড়িয়ে রইলেন ।
রিমির কন্ঠস্বর এবার ভেঙে পড়লো, চোখের জলের ধারায় ভাসতে ভাসতে সে বললো, “তিনি আমার মায়ের ছবিগুলো, যেগুলো আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম, সেগুলো আমার চোখের সামনে ছিড়ে ফেললো । আমার মা... তাকে আমার মনে রাখার মাধ্যম ছিলো শুধু ওই ছবিগুলোই ।“
শুনতে শুনতে আয়েষার নিজের চোখও ভিজে উঠতে লাগলো । সে কোন কথা না বলে চুপ করে শুনতে লাগলো ।
রিমি বলতে লাগলো, “আমি চিৎকার করে বললাম, এটা অন্যায় । এটা আপনি কেন করলেন?“ নতুন মা আমার গালে সজোরে একটা চড় মারলেন, আর বললেন, “যদি এখানে থাকতে চাও, তাহলে চুপচাপ আমি যা করবো বা আমি যা বলবো মেনে নিয়ে থাকতে হবে । নইলে এই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও ।“ আমি সত্যিই বেরিয়ে এলাম, কোন গন্তব্য ছাড়াই । সারাদিন হেটেছি, কিছুই খাওয়া হয়নি । তারপরে হঠাৎ জোরে বৃষ্টি নামলো । আপনার বাড়ির সামনে দিয়েই যাচ্ছিলাম, দেখলাম আলো জ্বলছে । ভাবলাম ... শেষ চেষ্টা, তাই আপনার বাড়ির দরজার বেল বাজালাম ।
রিমির বলা শেষ হলে সে আয়েষার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মাথা নীচু করে বসে রইলো । বাইরে বৃষ্টি একটু কমে এসেছে, ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে ছাদের কার্নিশ থেকে । সারা ঘরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা । রিমির দিকে নীরব হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আয়েষা যেন ভেসে যেতে গেলো অতীতের সমুদ্রে ।
অতীতের ছায়া
সেই অতীতে, ছোটবেলায় তার সৎ-মা যখন তার উপর অত্যাচার শুরু করলো, সে পায়ে হেঁটে চলে গিয়েছিলো তার মাসীর কাছে । তার মাসী আর মেসো ছিলো খুব গরীব । কিন্তু তারা আয়েষাকে তাড়িয়ে দেয়নি, বরং যতোদিন সম্ভব তাকে কাছে রেখেছে । আইনীভাবে তার জন্য লড়া্ই করেছে । আর সেইজন্য তাদের সঙ্গে তার বাবা আর সৎমা’র শত্রুতাও তাঁরা সহ্য করেছিলেন । তারপরে তাঁরা আয়েষার থাকা-খাওয়া-পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো একটি আশ্রমে । যতোটা সম্ভব খোজখবরও রাখতেন তাঁরা ।
আবার অন্যদিকে, সেই কলেজের দিনটার কথা, যখন তার বান্ধবী সীমা একই সমস্যায় পড়েছিলো । সীমার স্টেপ-ফাদার তার প্রতি অসদাচরণ করত, আর সীমা সাহায্য চেয়েছিল আয়েষার কাছে । কিন্তু আয়েষা তখন ভয় পেয়ে গিয়েছিলো । ভেবে পায়নি, যদি সীমার স্টেপফাদার কোন অ্যাকশন নেয় তাহলে সে কি করবে ? পরের দিন সীমা কলেজে আসেনি, আয়েষা শুনেছিলো সীমা সারা রাত পার্কে একা বসেছিলো । আয়েষা আজও ভাবে যদি সেই রাতে সে সীমাকে একটু সাহস করে আশ্রয় দিতো, তাহলে হয়তো সীমার জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো ।
“তুমি কি বাড়ি ফিরে যাবে?” আয়েষা নীরবতা ভেঙে রিমিকে জিজ্ঞাসা করে ।
“না । কখনোই নয়”, রিমির উত্তর ছিলো দৃঢ়, কিন্তু তার চোখে ছিলো ভয় । “যদি ফিরে যাই, তাহলে নতুন মা আমার উপর আরো অত্যাচার করবে । আমি পড়াশোনা করতে চাই, নিজের পায়ে দাড়াতে চাই । সেখানে গেলে আমায় উনি পড়াশোনা করতে দেবেন না । তিনি বলেছেন, মেয়েদের নাকি বেশি পড়াশোনা করার দরকার নেই ।“
বাইরে বৃষ্টি প্রায় থেমে গেছে । আয়েষা একটা গভীর শ্বাস ছেড়ে বললো, “ঠিক আছে, আজ রাতটা এখানেই থাকো । কাল সকালে আমরা ভাববো, তোমার জন্য কি করা যায় । আশা করি, কিছু একটা উপায় তো বেরোবেই ।“
রাতের কথোপকথন
সেদিন রাতে আয়েষা সাদামাটা কিন্তু স্বাস্থ্যকর খাবার রান্না করলো – ভাত, ডাল, সবজি আর মাছ । কিন্তু রিমি যেন অনেকদিন পর নিজের ইচ্ছামতো খাবার খেতে খুশিই হলো । খা্ওয়া-দাওয়ার পর তারা বসার ঘরে বসে আয়েষা আর রিমি অনেক কথা বললো । তারা ব্ইয়ের বিষয়ে আলোচনা করলো । রিমি জানালো যে, সে সাহিত্য পড়তে ভালোবাসে, বিশেষ করে বাংলা কবিতা । কিন্তু সে ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে কলেজে পড়তে চায় ।
এরই মাঝে আয়েষা একবার তাকে জিজ্ঞাসা করলো, “তোমার বাবাকে কি একবার জানানো উচিত নয় যে, তুমি এখানে আছো?”
রিমি আঁতকে উঠে বললো, “না, না, যদি জানাই, তাহলে তিনি এসে আমাকে আবার বাড়ি নিয়ে যাবেন । আর নতুন মা আমার উপর আরো অত্যাচার শুরু করবেন । আপনি কি আমাকে বার করে দিতে চাইছেন ? আমার উপর একটু দয়া কি আপনি করতে পারেন না?”
রিমির চোখেমুখে ফিরে আসলো আতঙ্কের ছায়া । আয়েষা তাকে নিশ্চয়তা দিলো, “না, আমি তোমাকে বার করে দিতে চাইছি না । কিন্তু আমাদের আইনী ভাবে কিছু করা উচিত, নয়তো আমি বিপদে পড়তে পারি । কারণ তুমি নাবালিকা ।“
আয়েষার তখন মনে পড়ে গেলো তার এক বন্ধুর কথা । অনিন্দ্য জানা, সে একজন নামকরা আইনজীবি । সে মনে মনে ঠিক করে নিলো তাকে কল করার কথা ।
তারপরে সে রিমিকে ডেকে একটা বেডরুম দেখিয়ে বললো, “এইটা তোমার ঘর । কোন সমস্যা তৈরী না হওয়া অবধি তুমি এখানেই থাকবে নিজের মতো করে । যাও, এখন শুয়ে পড়ো, কাল সকালে দেখা যাবে তোমার জন্য কি করা যায় ।“
রিমি ধীর পায়ে সেই ঘরে যেতে যেতে একটু থমকে দাঁড়ায়, আর জিজ্ঞাসা করে “আপনি কেন আমায় এতো সাহায্য করছেন ? আমি তো আপনার কেউ নই ।“
উত্তরে আয়েষা একটু হেসে বলে, “কারণ আমি একবার আমার এক বান্ধবীকে সাহায্য করতে পারিনি । আর আমাকেও কেউ সাহায্য করেছিলো । তোমাকে সাহায্য করে হয়তো সেই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি আর কৃতজ্ঞতার কিছুটা শোধ করতে পারবো ।“
আয়েষা তার ঘরে গিয়ে অনিন্দ্যকে ফোন করলো আর সব ঘটনা জানালো । অনিন্দ্য সব শুনে বললো, “প্রথমে পুলিশকে জানানো উচিত যে মেয়েটি নিরাপদে আছে । না হলে কিন্তু তোর বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা হতে পারে । তারপরে আমরা শিশু কল্যাণ বোর্ডের সাথে কথা বলতে পারি ।“
“কিন্তু সে তো বাড়ি ফিরে যেতে চায় না” আয়েষা অনিন্দ্যকে বললো ।
“কিন্তু সেটা তো আইন শুনবে না, আর তাই তার আর তোর নিরাপত্তার জন্য সেটার জন্য আইনী উপায় বার করতে হবে । তুই চিন্তা করিস না, আমি দেখে নেবো ।”
এরপরে অনিন্দ্য তাকে কাল সকালে কাছাকাছি থানায় পৌছাতে বললো, আর আশ্বস্ত করলো যে সে-ও থানায় থাকবে, চিন্তার কিছু নেই ।
অনিন্দ্যর সঙ্গে কথা বলে আয়েষা একটু আশ্বস্ত হলো ।
পরের দিন – এক নতুন শুরু
পরের দিন সকালে আয়েষা রিমিকে নিয়ে অনিন্দ্যর দেওয়া সময়মতো পুলিশ স্টেশনে উপস্থিত হলো । রিমি একটু ভয় পেয়েছিলো, কিন্তু আয়েষা তাকে অনিন্দ্যর কথা বলে বোঝানোর পর সে ভরসা পেলো আর কোন প্রতিবাদ না করে আয়েষার সঙ্গে চলে এসেছিলো ।
অনিন্দ্যর উপস্থিতিতে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী লেখানো হলো যে, রিমি নিরাপদে আছে এবং সে কোনমতেই তার বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছুক নয় এবং তার কারণ সমূহ ।
দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার রিমির দেওয়া নম্বর অনুযায়ী তার বাবাকে কল করলেন । ফোনে প্রথমে রিমির বাবা চেঁচামেচি করতে লাগলেন । তিনি রিমিকে তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলতে লাগলেন ।
তিনি রিমি কার কাছে আছে, কিরকম আছে ইত্যাদি জানতে চাইলে আয়েষা জানালো যে, রিমি তার কাছে আছে এবং নিরাপদে আছে । কিন্তু রিমির বাবা আয়েষাকে সন্দেহের চোখে দেখতে লাগলো এবং বলতে লাগলো সে নাকি রিমিকে আটকে রেখেছে । তখন আয়েষা তাকে বললো, “আপনি আপনার মেয়ের সঙ্গে কথা বলুন । তার কি সমস্যা শুনুন ।“
তিনি রিমির সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন, কিন্তু রিমি তার সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকার করলো । তখন রিমির বাবা আয়েষাকে হুমকি দিতে লাগলো তিনি আদালতে যাবেন এবং আয়েষার বিরুদ্ধে মামলা করবেন যে, সে নাকি রিমিকে ভুল বুঝিয়ে আটকে রেখেছে ।
ঠিক এই সময় অনিন্দ্য অবতীর্ণ হলো এবং রিমির বাবাকে জানালো যে, তিনি নিশ্চিন্তে আদালতে যেতে পারেন । কিন্তু এখানে অলরেডি তারা পুলিশ স্টেশনে একটি ডায়েরী লিখিয়েছে, যেখানে রিমি সেই ডায়েরীতে জানিয়েছে যে সে পিতার সঙ্গে থাকতে নিরাপদ বোধ করে না এবং তার কারণ কি কি । সুতরাং এমতাবস্থায় রিমির বাবা আদালতে গেলে তিনি এবং তার বর্তমান স্ত্রী্কে আদালতে আসতে হবে । সেখানে যদি রিমির সাক্ষ্য যদি তাদের বিরুদ্ধে যায় তাহল আদালত তো রিমিকে অন্যত্র থাকার অনুমতি দেবেই । শুধু তাই নয়, একজন নাবালিকার উপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অপরাধের আওতায় আসবেন তারা, যা তার এবং তার বর্তমান পরিবারকে বিপদে ফেলতে পারে ।
অনিন্দ্যর এই সমস্ত আইনী কথায় রিমির বাবা একটু নরম হয়ে গেলেন । শেষে রিমির নিরাপত্তার জন্য অনুরোধ করে তিনি ফোন রেখে দিলেন ।
অনিন্দ্য আয়েষাকে বললো, আমরা শিশু কল্যাণ বোর্ডের কাছে আবেদন করতে পারি সাময়িক অভিভাবকত্বের জন্য । যেহেতু রিমির বয়স সতেরোর কাছাকাছি এবং সে সুস্থ মনের, তাই আদালত্এবং বোর্ড তার ইচ্ছার মূল্য দেবে । তারপর প্রাপ্তবয়স্ক হলে সে তার সিদ্ধান্ত পুনরায় বোর্ডের কাছে আবেদন করতে পারে এবং তার তখনকার সিদ্ধান্ত জানাতে পারে । এখন আপাতত যা কাগজপত্র দরকার তা আমি পুলিশকে জমা দিয়ে দিচ্ছি ।
একটি নতুন শুরু
পরের কয়েকটা দিন যেন ঘটনার স্রোতে ভেসে মূহুর্তের মধ্যে কেটে গেলো । শিশু কল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তারা বেশ কয়েকবার আসলেন, রিমির সঙ্গে তাদের কথোপকথন রেকর্ডিং করলেন । প্রতিবারই রিমি স্পষ্ট এবং দৃপ্ধভাবে জানালো যে, সে এখানেই থাকতে চায়, বাড়ি ফিরে যেতে চায় না । এখানে থেকে সে পড়াশোনা করতে চায় ।
অবশেষে আদালতে শিশু কল্যাণ বোর্ড আয়েষাকে রিমির সাময়িক অভিভাবক করার জন্য তার বাবাকে ডেকে পাঠালো । তার বাবা সামান্য আপত্তি করলেও যখন তাকে বোঝানো হলো, যে এটা একটা আইনী প্র্র্রক্রিয়া এবং তিনি এর বিরুদ্ধে গেলে সাজা পেতে পারেন, তখন তিনি আর আপত্তি করলেন না ।
রিমি স্থানীয় একটি স্কুলে ভর্তি হলো । আয়েষার একাকী জীবন এখন ব্যস্ত, প্রাণবন্ত । তাদের দু’জনের জীবন কাটতে লাগলো্এক নতুন ছন্দে । আয়েষা কাজ থেকে ফিরে সাহায্য করতো রিমির পড়াশোনায় । রিমির স্কুলের গল্প, বই পড়া, নতুন বন্ধু, নতুন জীবনের স্বাদ – সবকিছুতে আয়েষা ভাগ পেতে লাগলো ।
বেশ কয়েক মাস এইভাবে কেটে গেলো । হঠাৎ এক রবিবার রিমির বাবা এসে হাজির হলেন আয়েষার বাড়িতে । আয়েষা তাকে বসার ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন । রিমি প্রথমে ভয় পেয়ে গেলো, কিন্তু তবুও আয়েষার ভরসায় সে বাবার কাছে উপস্থিত হলো । রিমির বাবা রিমিকে বললেন, “আমি ভেবেছি অনেক । আমি আমার মেয়েকে হারাতে চাই না । তুমি যদি চাও, তাহলে আমি তোমার জন্য আলাদা বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে তোমার সঙ্গে থাকবো । তুমি সেখানে তোমার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে ।“
কিন্তু রিমি বললো, “আমি এখানে ভালো আছি বাবা । আপনি যখন খুশি ছুটির দিনে আসতে পারেন । কিন্তু আমি আর পুরানো জীবনে ফিরে যাবো না ।“
রিমির বাবা আর কথা বাড়ালেন না । হয়তো বুঝলেন মেয়ের মন । শুধু চলে যাওয়ার সময় আয়েষাকে হাতজোড় করে “আপনার প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা । আপনি আমার মেয়েকে রক্ষা করেছেন, তাকে নিরাপদে রেখেছেন, ভালোবাসা দিয়েছেন । আমি ..... আমি ঠিক মতো তাকে দেখতে পারিনি“ - এই কথাগুলো বলে আর দাঁড়াননি তিনি ।
জীবন সুযোগ দেয় .......
কয়েক বছর কেটে গেছে । রিমি এখন কলেজে পড়ে । পড়াশোনায় সে ভালো ফল করছে । আয়েষার সঙ্গে তার সম্পর্ক মা ও মেয়ের মতোই, যদিও রিমি তাকে মাসী বলে । প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সে আদালতে জানিয়েছে যে সে অন্য কোথাও নয়, তার মাসীর কাছেই থাকবে । আয়েষার আপত্তি না থাকায় তার পড়াশোনার ফল ইত্যাদি দেখে আদালতও কোনরকম আপত্তি করেনি ।
এক সন্ধ্যায় তারা দু’জনে বসে বারান্দায় চা পান করতে করতে গল্প করছে । হঠাৎ রিমি বললো, “আচ্ছা মাসী জানো, সেদিন আমি যখন তোমার দরজায় দাঁড়িয়েছিলাম, আমার মনে হচ্ছিলো, এটাই শেষ চেষ্টা । যদি তুমি সেদিন দরজা না খুলতে, আমি জানতাম না আমি কি করবো । হয়তো আমি ধ্বংস হয়ে যেতাম । কারণ আমার আর কোন পথ খোলা ছিলো না । যেদিকেই যেতাম, ধ্বংসই হতাম ।“
আয়েষা হাসলো, “যখন আমি দরজা খুললাম, তখনও আমি বুঝতে পারিনি যে, আমি কাউকে শুধু আশ্রয় দিচ্ছি না, আমি আমাকেই সাহায্য করছি । একটা জীবন বদলে দেওয়া নয়, বদলে যাবে আমার জীবনটাও ।“
রিমি একটু চুপ করে থেকে বললো, “তুমি হলে আমার জীবনের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত মানুষ । তুমি তখন আমায় গ্রহণ করেছিলে যখন কেউ আমায় চায়নি, সবাই ফিরিয়ে দিয়েছিলো ।“
আয়েষা রিমির দিকে তাকিয়ে বললো, “না রিমি, অতিথি তো তুই ছিলিস আমার জীবনে । কিন্তু সে তো সেদিনকার জন্য । এখন তো তুই এই বাড়িরই সদস্য । আমার পরিবার ।“ রিমি আরো কিছুক্ষণ বসে চলে যায় তার পড়ার ঘরে ।
আয়েষা একা বসে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে । সন্ধ্যার আকাশে তারা উঠছিলো একে একে । শহরের আলোগুলো এক এক করে জ্বলতে শুরু করেছে । আয়েষা ভাবতে থাকে, কখনো কখনো জীবন সবচেয়ে সুন্দর উপহার দেয় এক অপ্রত্যাশিত মূহুর্তে । একটা বন্ধ দরজা খুলে দিতে এক সেকেন্ডের সময় আর সাহস লাগে, কিন্তু সেই এক সেকেন্ড কিভাবে দু’জনের জীবন বদলে দিতে পারে চিরকালের জন্য ।
শেষের কথা …..
জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারগুলো কখনো কখনো সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত মূহুর্তে পাওয়া যায় – কোন অচেনা মানুষের মাধ্যমে । তাই দরজাটা খুলে দিতে কখনো দ্বিধা করো না । হয়তো সেটিই তোমার, আর কারো না হোক, জীবনের পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দরজা ।
ভালোবাসার গল্প পড়তে ক্লিক করুন - ভালোবাসার গল্প
আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন - গল্পের ঝুলি
গল্প পড়ে যদি ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, চেনা-পরিচিতদের মধ্যে “গল্পের ঝুলি”র লিঙ্ক শেয়ার করবেন । কমেন্ট করবেন, তাহলে আমরা উৎসাহিত বোধ করবো আরো কিছু লেখার । নতুন গল্পের নোটিফিকেশন ফ্রি-তে পাওয়ার জন্য আপনার ই-মেল শেয়ার করতে পারেন কমেন্ট বক্সে ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন