বাংলা প্রেমের গল্প : কখনো ভেবেছেন, দরিদ্র এক ছেলে যাকে দূরের স্কুলে যাওয়ার জন্য সাইকেল চালাতে হয়, তার আর ধনী উকিলের মেয়ের মধ্যে প্রেম সম্ভব?

কিন্তু যখন সেই প্রেমে জড়িয়ে পড়ে দুর্ঘটনা, কোমা, ভুলে যাওয়া স্মৃতি... তখন কি হয় তার পরিণতি?

এই গল্প শুধু প্রেমের নয়, সংগ্রামের।ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের। আর অসম্ভবকে সম্ভব করার।

এক কাপ চা নিয়ে বসুন । আর ডুবুন সুব্রত আর সুনন্দার জীবনে।

যেখানে প্রতিটি বাধা এসেছে শুধু প্রেমকে, ভালোবাসাকে আরো শক্তিশালী করার জন্য।

বাংলা প্রেমের গল্প : পরিণতি

পরিণতি

দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছেলে

সুব্রত অজ পাড়া গাঁয়ের একটা সাধারণ পরিবারের একটি ছেলে । গ্রামেরই একটা সাধারণ বাংলা মিডিয়াম স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ে সে, পড়াশোনায় সে খুব ভালো । ছোটবেলা থেকেই সে ক্লাসের পরীক্ষায় ফার্স্ট অথবা সেকেন্ড হতো । সেইজন্যই স্কুলের স্যারেরা বা তার বাবা-মা আশা করতেন সে মাধ্যমিকে ভালো ফল করবে ।

আর সে করলোও তাই । মাধ্যমিকে সুব্রত খুবই ভালো ফল করলো তাদের স্কুল থেকে । কিন্তু এবারই তো সমস্যা । কারণ সে সায়েন্স নিয়ে পড়তে চায় । কিন্তু তাদের স্কুলে উচ্চমাধ্যমিকে সায়েন্স বিভাগ নেই । যদি তাকে সায়েন্স নিয়ে পড়তে হয় তাহলে কাছের মফস্বল শহরের স্কুলে যেতে হবে ।

স্কুল পরিবর্তন ও সংগ্রাম

কিন্তু সেখানে যেতে হলে তাকে বাসে যেতে হবে । রোজ বাসে করে যাওয়া-আসা, পড়াশোনার খরচ, সায়েন্সের বইয়ের দাম, টিউশনের খরচ – সব মিলিয়ে যা খরচ তা তার বাবার পক্ষে চালানো অসম্ভব । তাই তার বাবা তাকে বোঝাতে লাগলো, ষে সে যেন কাছের স্কুলেই আর্টস বা কমার্স বিভাগে ভর্তি হয়ে যায় । কিন্তু সুব্রতর জেদের কাছে তার বাবাকে হার মানতে হয় । সে সব সমস্যার সমাধান করে দেয় । যাওয়া-আসার জন্যে সে সাইকেলে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে । আর পড়াশোনা ইত্যাদি খরচের জন্যে শুরু করে দেয় বিকালে টিউশন ।

নতুন স্কুলে ভর্তির টাকা তার বাবা কষ্ট করে হলেও যোগাড় করে তার হাতে তুলে দেয় । স্কুলের সময়ের বেশ কিছুটা আগে সুব্রত বেরিয়ে পড়তো সাইকেল নিয়ে । কারণ তাকে অনেকটা পথ যেতে হবে । প্রথম দিকে একটু অসুবিধা হলেও ধীরে ধীরে সুব্রত নতুন স্কুলে মানিয়ে নেয় । আসলে এই স্কুলে তার সঙ্গে যারা পড়তো তাদের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো । কিন্তু সুব্রত তার পড়াশোনা দিয়ে স্যারেদের, আর সুন্দর ব্যবহার দিয়ে বন্ধুদের মন জয় করে নেয় ।

স্কুলেরই কয়েকজন স্যারেদের কাছে সামান্য টাকায় সে টিউশন পড়তে শুরু করে । মেধাবী আর মনোযোগী ছাত্র পেয়ে স্যারেরাও তাকে সাহায্য করতে শুরু করে । বিশেষত: অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডস্যার, যিনি আবার সুব্রতদের জীবন বিজ্ঞান পড়াতেন, তিনি সুব্রতকে যতোরকম ভাবে পারতেন সবরকম ভাবে সাহায্য করতেন । নিজে তাকে বিনা পয়সায় পড়াতেন এবং তার কাছে প্রকাশকেরা যতো স্পেসিমেন বই পাঠাতো, বিজ্ঞান বিভাগের বই হলেই তিনি সেইসব বই সুব্রতকে দিয়ে দিতেন । তাছাড়াও পুরানো ছাত্রদের থেকে বই চেয়ে নিয়ে তিনি প্রায় সব বই সুব্রতকে যোগাড় করে দিলেন । সুব্রতকে একটা বইও প্রায় কিনতে হলো না ।

সবই ঠিকঠাক চলছিল, সুব্রতর পড়াশোনাও । একাদশ শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষায় সে প্রায় নব্বই শতাংশ নম্বর পেয়ে দ্বাদশ শ্রেণীতে উঠলো । স্যারেরা সবাই প্রায় দারুণ সাফল্যের এক গন্ধ পেতে শুরু করলেন । কারণ, সুব্রত এইরকম আংশিক সাহায্য পেয়েই যদি এইরকম রেজাল্ট করতে পারে, তাহলে তাকে আরো সাহায্য করলে নিশ্চয়ই সে আরো ভালো ফল করবে এমনকি রাজ্যে প্রথম দশের মধ্যেও স্থান করে নিতে পারে উচ্চ-মাধ্যমিকে সে সম্পর্কে স্যারেরা প্রায় নিশ্চিত হয়ে পড়েছিলেন । আর সেটা হলে স্কুলের তথা স্যারেদেরও মুখ উজ্জ্বল হবে, এই ভেবে তারা সুব্রতকে আরো সাহায্য করতে লাগলেন ।

ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা

কিন্তু যা ভাবা হয়, তা সবসময় সঠিক হয় না । সুব্রতর একাদশ শ্রেনীর একটি মেয়েকে হঠাৎ ভালো লেগে গেলো । তার নাম সুনন্দা দত্ত । বাবা বিশ্বানাথ দত্ত, সেই অঞ্চলের নামকরা ডাকসাইটে উকিল । কিন্তু সুব্রতর অল্প বয়সের আবেগ, সে আগুপিছু ভাবে না বা তার মনে আসে না ।

সুনন্দার ছায়াসঙ্গিনী বন্ধু শম্পা দাস, দু’জনে পাশাপাশি বাড়িতে থাকে । একই সঙ্গে হেঁটে স্কুলে আসে, বাড়ি যায় । স্কলের খুব কাছেই তাদের বাড়ি । বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটু হেঁটে এলেই বড় রাস্তা । আর বড় রাস্তা ধরে হাঁটলে হয়তো এক কিলোমিটার পায়ে হাঁটলে তাদের স্কুল । কিছুদিন হলো শম্পা লক্ষ্য করে একটি ছেলে সাইকেলে করে স্কুল থেকে ফেরার সময় তাদের পিছু পিছু আসছে । আবার স্কুলে আসার সময়েও দেখে তারা বড় রাস্তায় উঠলেই ছেলেটা তাদের পিছু পিছু সাইকেল নিয়ে আসে । সে সুনন্দাকে ঘটনাটা বলে ।

বেশ কিছুদিন এইরকম যাওয়ার পরে হঠাৎ নবীনবরণের দিন ছেলেটা এগিয়ে আসে সুনন্দার দিকে । আর নিজের পরিচয় দিয়ে বন্ধু হওয়ার প্রস্তাব দেয় । সুনন্দা আপত্তি করে না । কিন্তু পরদিন তারা দু’জনে স্কুল থেকে বেরিয়ে দেখে সুব্রত দাঁড়িয়ে আছে স্কুলের বাইরে । সুনন্দারা এলে সে বলে চলো, একসঙ্গে হেঁটে যাই । সুনন্দা তাকে জানায়, তার বাবা যদি জানতে পারে, সে সুনন্দার সঙ্গে স্কুলের বাইরে কথা বলছে, সেটা সুব্রতর জন্য ভালো হবে না । কিন্তু সুব্রত বলে, সে কাউকে ভয় করে না । সে একসঙ্গে হেঁটে যাবে, যায়ও ।

ভালোবাসায় বাধা

কিছুদিনের মধ্যেই বিশ্বনাথবাবুর কানে খবরটা চলে যায় । আর তিনি এসে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডস্যারের সঙ্গে কথা বলেন । আর অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডস্যার সুব্রতকে ডেকে পাঠান । অনেকক্ষণ ধরে সুব্রতর সঙ্গে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডস্যারের কথা হয় স্যারের ঘরে, দরজা বন্ধ করে । সেই ঘরে কি কথা হয়েছিলো কেউ জানে না । কিন্তু পরদিন থেকে সুব্রত বেশ কিছুদিন আর স্কুলে আসে না ।

সুনন্দার চিন্তা হতে থাকে, তার বাবার জন্য সুব্রতর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলে সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না । কারণ, ছাত্র হিসাবে সে সুব্রতর নামডাক শুনেছে । সে শম্পার মাধ্যমে সুব্রতর ফোন নম্বর যোগাড় করে । আর শম্পার ফোন থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে । তাদের মধ্যে যোগাযোগ হতে থাকে । কিন্তু সুব্রত স্কুলে আসা একদমই প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে । শুধুমাত্র তাদের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের দিন সে আসে, সেরকম কারো সঙ্গে কোন কথা বলে না । চুপচাপ ক্লাস করে বাড়ি চলে যায় ।

টেস্ট পরীক্ষার সময় অবধি সুব্রত প্রায় সেরকমই করে যায়, আর টেস্টের পরে সুব্রত স্কুলে আসা একদমই বন্ধ করে দেয় ।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর সে একদিন সুনন্দার বাড়ি গিয়ে বিশ্বনাথ বাবুর সঙ্গে দেখা করে বলে শোনা যায় । শোনা যায়, সে নাকি গিয়ে তার ভালোবাসার কথা জানিয়ে তাকে সুযোগ দেওয়ার জন্যে অনুরোধ করে বলে বিশ্বনাথ বাবু যেন তাকে পাঁচটা বছর সময় দেন । যাতে সে কিছু করে দেখাতে পারে এবং তার পরে এসে সে সুনন্দাকে বিয়ে করতে চায় । আর যদি সে কিছু করতে না পারে, তাহলে বিশ্বনাথবাবুর যা সিদ্ধান্ত হবে, সে মাথা পেতে মেনে নেবে । বিশ্বনাথবাবু নাকি এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন এই শর্তে, এই পাঁচ বছরের মধ্যে সে সুনন্দার সঙ্গে কোনরকম যোগাযোগ রাখতে পারবে না । আর বিশ্বনাথবাবু যদি জানতে পারেন যে, সে সুনন্দার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে তাহলে তিনিও কথার খেলাপ করতে বাধ্য হবেন ।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বেরোলে দেখা গেলো, সুব্রত স্যারেদের আশানুরূপ রেজাল্ট করতে পারলো না । প্রায় বিরানব্বই শতাংশ নিয়ে সে তার নিজের জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করলেও রাজ্যের প্রথম দশের মধ্যে সে স্থান করে নিতে পারেনি । আর অদ্ভুত ব্যাপার সে স্কুলে রেজাল্ট নিতেও আসলো না ।

সুব্রতর বাবা গ্রামের একজনকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে রেজাল্ট নিতে এলেন । সুব্রত কি করছে বা কি করবে ভাবছে তিনি কিছুই বলতে পারলেন না । শুধু বললেন, তার গ্রামের এক দাদা, যে বাইরে চাকরী করে, কিন্তু মাঝে মাঝে বাড়িতে আসে এবং সুব্রতকে খুব ভালোবাসে, সে বাড়িতে কম্পিউটার কিনেছে এবং সুব্রত প্রায়ই তার কাছে গিয়ে কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকে । তার সেই দাদার নাম জয়ন্ত, সে বাড়িতে বলে রেখেছে তার অবর্তমানেও যেন সুব্রতকে কম্পিউটারে কাজ করতে দেওয়া হয় ।

কিছুদিন বাদে স্যারেরা খবর পেলেন, সুব্রত আই.আই.টি-র প্রবেশিকা পরীক্ষায় দারুণ রেজাল্ট করেছে এবং সে রুরকি ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়ে গেছে । স্যারেরা মনে মনে দারুণ খুশি হলেন । কিন্তু সুব্রত স্কুলে এলো না, ফলে বাকি ছাত্ররা বা অন্য কেউ সেই খবর পেলো না ।

সুব্রত আই.আই.টি পড়তে চলে গেছে, শম্পার মাধ্যমে সে সুনন্দার সঙ্গে খবরাখবর আদানপ্রদান করে । এইরকম করে বেশ কয়েক বছর কেটে যায় । সুনন্দার গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়ে যাওয়ার পরে বিশ্বনাথবাবু তাকে নিয়ে সপরিবারে তার দেশের বাড়ি ছুটি কাটাতে যান । বিশ্বনাথবাবুর দেশের বাড়ি বর্ধমানের পূর্বস্থলীতে । সেখানে তাদের আদি বাড়ি, প্রচুর জমি-জায়গা, বিশাল সম্মান-প্রতিপত্তি । কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর থেকে শম্পার সঙ্গে সুনন্দার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, সুনন্দাও কোন যোগাযোগ করছে না, কোনভাবেই না ।

এদিকে সুব্রত সুনন্দার কোন খবর না পেয়ে ছটফট করছে । আর বারবার শম্পাকে যোগাযোগ করে জানতে চাইছে সুনন্দার কোন খবর আছে কিনা । আসলে সুব্রতর পক্ষেও এখন আর যখন ইচ্ছে শম্পাকে যোগাযোগ করা সম্ভব নয় । কারণ সে এখন থাকে সুদূর ক্যালিফোর্নিয়ায় । আই.আই.টি থেকেই ভালো রেজাল্ট করার সুবাদে কলেজ ক্যাম্পাসিং থেকে সে এখন একটা খুব বড় সফ্টওয়্যার কোম্পানীতে খুব বড় পদে চাকরী করে । সেখান থেকে সে প্রথম বারের মতো ফিরেই দেখা করবে বিশ্বনাথবাবুর সঙ্গে, সুনন্দার সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলার জন্যে, সেরমই ঠিক আছে ।

সুনন্দার খবর না পেয়ে ছটফট করে বেশ কয়েকটা দিন কেটে যায় সুব্রতর । তার মন সারাক্ষণ কিছু একটা অস্বস্তিতে ভোগে । হঠাৎ একদিন শম্পার একটা টেক্সট মেসেজ আসে তার মোবাইলে – “কল মি আর্জেন্টলি” । সুব্রত তাড়াতাড়ি তার হাতের কাজ সেরে কল করে শম্পাকে । কিন্তু শম্পার কথা শুনে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, মনে হয় পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যাবে ।

হৃদয়বিদারক খবর

আসলে শম্পা তাকে জানায়, বর্ধমানে গিয়ে বিশ্বনাথবাবু সুনন্দার ফোন নিয়ে নেন এবং তাকে গৃহবন্দী করে জানান, তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে । দেশের বাড়ি থেকেই তার বিয়ে হবে । হাজারিবাগের একটি সম্ভ্রান্ত এবং ধনী পরিবারের উচ্চশিক্ষিত, সুদর্শন একটি ছেলের সঙ্গে তিনি তার বিয়ের সমস্ত ব্যবস্থা করে ফেলেছেন । সে যেন কাউকে কোনভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা না করে । সুনন্দা আজ লুকিয়ে অন্য একজনের ফোন থেকে আমাকে এই সমস্ত জানিয়েছে । কিন্তু যদি সব ঠিক থাকে, তাহলে তুমি যদি পরশুও ফেরো, তাহলেও কোন লাভ হবে না । কারণ হিসাবমতো যা দিনক্ষণ স্থির হয়েছে, তাতে গতকাল তার বিয়ে হয়ে যাবে ।

সুব্রত কিছুই বুঝে উঠতে পারে না । তার চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসে, সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মাটিতে পড়ে যায় । যখন তার জ্ঞান ফেরে সে দেখে, সে অফিসের রিফ্রেশ রুমে শুয়ে আছে । আর তার সহকর্মীরা তাকে ঘিরে উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে । তার জ্ঞান ফিরলে সবাই তার খোঁজখবর নিয়ে যে যার কাজে ফিরে যায়, শুধু রয়ে যান তার বস ।

তিনিও একজন ভারতীয়, সুনীল স্যার । তিনি তার কাছে জানতে চান, কি হয়েছে জানাতে । যদি সেইরকম কিছু হয়, তিনি তাকে নিশ্চয়ই সাহায্য করবেন । সুব্রতর মনের কথা কাউকে বলার নেই, এতোগুলো বছর শুধু সে মুখ বুজে একা লড়াই করে গেছে একটা উদ্দেশ্য নিয়ে ।

আজ আর সে পারলো না । সব কিছু সে বলে দিলো তার বসকে । তিনি বন্ধুর মতো সব শুনলেন । শুনে বললেন, চিন্তা কোর না । আমি এখুনি অফিসকে রাজি করিয়ে তোমার জন্য ইন্ডিয়ার সব থেকে আগের ফ্লাইট বুক করাচ্ছি । তুমি তৈরী হয়ে নাও, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ভারতে পৌঁছাও । তারপর বাকিটা ছেড়ে দাও ভাগ্যের হাতে, তবে তোমার কাহিনী শোনার পরে আমার মন বলছে, তোমার কাহিনীর পরিণতি এভাবে হতে পারে না । তুমি আমার কথায় বিশ্বাস করো, দেখো তোমার জন্যে অন্য কিছু অপেক্ষা করছে, এটা আমার বিশ্বাস ।

সুব্রতর বস সব ব্যবস্থা করে দিলেন, যতো তাড়াতাড়ি সে যেন ভারতে পৌছে যেতে পারে । আর বলে দিলেন, ভারতে পৌঁছে সে যেন সবসময় তার সঙ্গে যোগাযোগ করে । কোন জায়গায় জটিলতা দেখা দিলে তিনি তাকে নির্দেশ দেবেন কি করতে হবে, বা ব্যবস্থা করবেন যদি কিছু করা যায় । আর সে যেন তাকে বন্ধুর মতো সব কিছু বলে কোনরকম সংকোচ না করে । আর কোন অবস্থাতেই তার মোবাইল যেন বন্ধ না হয় ।

এয়ারপোর্টে পৌঁছে সে শম্পাকে জানিয়ে দেয়, সে কখন ভারতে পৌঁছাচ্ছে । এয়ারপোর্টে আসার পরে সে দেখলো তার বস মানে সুনীল স্যার তাকে সব ডিটেল পাঠিয়ে দিয়েছে । এয়ারপোর্টে তার জন্যে গাড়ি অপেক্ষা করবে তাকে যেখানে ইচ্ছে নিয়ে যাওয়ার জন্যে – সেই গাড়ির নম্বর, ড্রাইভারের নাম ইত্যাদি । এমনকি সে যদি চায়, তাহলে একটু স্নান, খাওয়া করে ফ্রেশ হয়ে নিতে পারে – তার জন্যে এয়ারপোর্টের সব থেকে কাছে একটা হোটেলও বুক করে রেখেছেন । পাঠিয়ে দিয়েছেন সেই হোটেলের নাম, ফোন নম্বর, রুম নম্বর ইত্যাদিও । কিন্তু এতো কিছুর পরেও সুব্রতর কিছুই ভালো লাগছে না । কারণ যেদিনকে সে ক্যালিফোর্নিয়ায় ফ্লাইটে উঠছে, হিসাবমতো সেইদিনই সুনন্দার বিয়ে হয়ে যাবে । তারপরে গিয়ে সে কি করবে ?

দুর্ঘটনা না ফিরে পাওয়া ? 

কলকাতায় এয়ারপোর্টে পৌঁছে সুব্রত দেখলো তার মোবাইলে অজস্র মিসড কল অ্যালার্ট, হোয়াটস অ্যাপে অনেক মেসেজ - প্রতিটা শম্পার । সুব্রত এয়ারপোর্ট থেকেই বেরিয়েই দেখলো ড্রাইভার তার নাম লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে তার জন্যে অপেক্ষা করছে । গাড়িতে উঠেই ড্রাইভার বললো, স্যার আমার উপর নির্দেশ আছে আপনি যেখানে বলবেন,  আপনাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার । প্রথমে কোথায় যাবো স্যার । সুব্রত বললো, দাঁড়াও, আগে একটা ফোন করে নিই তারপরে বলছি । বলে সে শম্পাকে কল করলো । শম্পা ফোনটা তুলেই উত্তেজিত হয়ে বললো,

শম্পা :  সুব্রত, তুমি কোথায় ?

সুব্রত : আমি কলকাতা এয়ারপোর্টে, গাড়িতে উঠলাম । কি হয়েছে ? কোথায় যাবো ঠিক করতে পারছি না ।

শম্পা : তুমি এখুনি যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব, বাইপাসের কাছে অ্যাপোলো হসপিটালে পৌঁছাও, আমি আছি সেখানে । যতো তাড়াতাড়ি পারো পৌঁছাও  ।সুব্রত : হসপিটালে যাবো ? কেন ? কি হয়েছে ?

শম্পা : সব জানতে পারবে, তাড়াতাড়ি পৌঁছাও, এর বেশি এখন আমি কিছু বলার অবস্থায় নেই । বলে শম্পা ফোনটা কেটে দিলো ।

সুব্রত ড্রাইভারকে অ্যাপোলো হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার জন্যে বলে চিন্তা করতে লাগলো – কার কি হয়েছে ? কি হতে পারে ? এইসব ভাবতে ভাবতে সে আবার শম্পাকে ফোন করলো । কিন্তু শম্পা ফোনটা কেটে দিলো । অজানা আশঙ্কায় সুব্রতর মনটা ভরে উঠেছে । সারা শরীর বিমানযাত্রার ধকলে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত । গাড়ির ঠান্ডায় তার একটু তন্দ্রামতো এসে গেলো ।

অ্যাপোলো হসপিটালে ঢুকে সে আবার শম্পাকে ফোন করলো, এবারে সে ফোন ধরলো আর বললো, নীচে রিসেপশনের কাছে আমি রয়েছি, তুমি এসে সোজা সেখানে চলে এসো । বাকি আসার পরে বলছি । উত্তরে সুব্রত বললো, আমি পৌঁছে গেছি, জাস্ট রিসেপশনের দিকে যাচ্ছি । সে ফোনটা কেটে দিলো ।

হসপিটালের রিসেপশন লাউঞ্জে ঢুকেই সে শম্পাকে দেখতে পেলো । সে শম্পার কাছে যেতেই সে বলতে শুরু করলো, চলো লিফটের দিকে যাই, যেতে যেতে ছোট করে বাকি ঘটনা বলছি । লিফটে উঠে সে যা বললো তার মানে করলে যা দাঁড়ায়, তা হলো সুনন্দার বিয়ের পরে সে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে তাদের গাড়ির সঙ্গে একটি ট্রাকের ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা হয় । যাতে তাদের গাড়ির সবাই, মানে তার সদ্য বিবাহিত স্বামী, গাড়ির ড্রাইভার এবং তার স্বামীর এক ভাই সবাই ঘটনাস্থলেই মারা যায় । কিন্তু সুনন্দা এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক । তাকে গাড়ি করে এনে এই হসপিটালে রাখা হয়েছে । কিন্তু সে এখন কোমা অবস্থায় অচৈতন্য হয়ে রয়েছে ।

এই খবর শুনে সুব্রত বুঝে উঠতে পারছিল না তার কি করা উচিত বা বলা উচিত । তার চোখের সামনে সব যেন অন্ধকার হয়ে যেতে বসছে, মাথা ঘুলিয়ে যাচ্ছে, মাথাটা কেমন যেন মনে হচ্ছে ফাঁকা হয়ে গেছে । সে লিফটের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে নিজেকে একটু ঠিক করে নিলো । কিন্তু সঙ্গে তার কানে সুনীল স্যারের কথাগুলো যেন এখন বাজতে লাগলো – “তোমার কাহিনীর পরিণতি এভাবে হতে পারে না । তুমি আমার কথায় বিশ্বাস করো, দেখো তোমার জন্যে অন্য কিছু অপেক্ষা করছে, এটা আমার বিশ্বাস ।” 

লিফট পৌঁছতেই তারা দেখলো উদ্বিগ্ন মুখে সুনন্দার বাবা, মা আরো কয়েকজন একটি কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন । সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো কেবিনের দিকে । সুনন্দার বাবা বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সুনন্দার মা তাকে আটকে দিলেন । শম্পা তাকে নিয়ে গেলো সুনন্দার কাছে ।

বাংলা প্রেমের গল্প

কেবিনে অচৈতন্য হয়ে শুয়ে রয়েছে সুনন্দা শাঁখা-সিঁদুর পরা, নববধূর বেশে, শরীরের ব্যান্ডেজগুলো ভুলে গিয়ে দেখলে মনে হবে যেন নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে । সুব্রত সুনন্দাকে দেখতে দেখতে মনে হলো তার সামনে যেন সব অন্ধকার হয়ে গেলো আর সে মাথা ঘুরে পড়ে গেলো । যখন সে একটু ঠিক হলো, দেখলো শম্পা আর সুনন্দার মা তাকে শুশ্রুষা করছে । সুনন্দার মা সুব্রতর কাছে হাতজোড় করে বললেন, “আমি কিচ্ছু জানতাম না বাবা, তুমি আমায় ক্ষমা করে দাও, কিন্তু তুমি ওকে বাঁচাও । আর বেঁচে গেলে তুমি ওকে অনেক-অনেক দূরে নিয়ে চলে যাও । কেউ তোমায় বাধা দেবে না, আমি আছি - সব আমি সামলে নেওয়ার ব্যবস্থা করবো ।“

সুব্রত একটু জল খেয়ে শম্পাকে বললো, “আমি ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে চাই ।“ শম্পা তাকে ডক্টর’স কেবিনে নিয়ে গিয়ে সুনন্দার চিকিৎসা করছে যে ডাক্তার তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো ।

ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে সুব্রত যা বুঝলো, সুনন্দা মাথার মেডুলা অবলঙ্গাটায় ভয়ঙ্কর চোট পেয়েছে এবং কবে বা কি করে সে কোমা থেকে বেরোবে সঠিক কেউ বলতে পারবে না, সত্যি কথা বলতে কি চান্স প্রায় নেই বললেই চলে এবং কোমা থেকে ফিরলেও আদৌ তার স্মৃতিশক্তি ফিরবে কিনা তা বলা যাবে না । কিন্তু কয়েকটা ছোট ছোট সঠিক অপারেশন করতে পারলে হয়তো সে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসলেও আসতে পারে । কিন্তু সেইসব অপারেশন করার মতো সঠিক যন্ত্রপাতি এবং সেইসব যন্ত্রপাতির মাধ্যমে অপারেশন করার মতো ডাক্তার এই মূহুর্তে কলকাতায় তথা ভারতে নেই ।

আমেরিকায় চিকিৎসা

সব শুনে এসে শম্পা সুনন্দার বাবা-মাকে সব জানালো । শুনে সুনন্দার মা ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো আর দোষারোপ করতে লাগলো বিশ্বনাথবাবুকে সুনন্দা এবং সুব্রতর উপর অন্যায়, অবিচার করার জন্যে । মুখ নীচু করে মাথায় হাত দিয়ে সুব্রত সব শুনতে পারছিলো, হঠাৎ তার মনে হলো তার বস সুনীল স্যারের কথা । সে সঙ্গে সঙ্গে টেক্সট করলো তাকে কল করার জন্যে । আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সুনীল স্যার তার মোবাইলে কল ব্যাক করলো ।

সুব্রত ছোট করে মোটামুটি সব কথা গুছিয়ে বললো । সব শুনে সুনীল স্যার উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, “ভগবান তোমায় আরেকটা সুযোগ দিয়েছেন সুব্রত । আমি তোমায় বলেছিলাম, তোমাদের শেষটা এরকম হতে পারে না । আমার বিশ্বাস, ভগবানের অন্য কোন ইচ্ছা আছে । আমায় কিছুটা সময় দাও সুব্রত, আর যদি সম্ভব হয় এখুনি হসপিটাল থেকে তার চিকিৎসার যা তথ্য আছে আমায় যেকোন উপায়ে মানে মেল করে বা হোয়াটস অ্যাপে যেভাবে পারো পাঠাও । আর কিছুক্ষণ পরে আমি তোমায় কল ব্যাক করছি ।“

পুরো কথাবার্তাটা ইংরেজীতে হচ্ছিল, তাই সুনন্দার মা কিছু বুঝতে পারেননি । শম্পা আবার তাকে বুঝিয়ে বললো আর সুব্রতর সঙ্গে আবার চললো হসপিটাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলতে । হসপিটাল কর্তৃপক্ষ কাগজপত্র দিতে কোন আপত্তি করেনি, বরং যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে এবং সুব্রতকে তাদের একটা কম্পিউটারও ব্যবহার করতে দিয়েছে কাগজপত্র পাঠানোর জন্যে ।

কাগজপত্র পাঠানোর পরে প্রায় একঘন্টা কেটে গিয়েছে । দমবন্ধ করা পরিবেশ । সবাই যেন অজানা কিছুর প্রতীক্ষায় বসে আছে । মাঝখানে একবার শম্পা একবার সুব্রতকে নিয়ে গিয়ে কফি খাইয়ে নিয়ে এসেছে । সুনন্দার আরো কিছু আত্মীয়-স্বজন এসে পৌঁছেছে । তারা কেউ সুব্রতর সঙ্গে কথা বলেনি । কিন্তু সুনন্দার মা তার সম্পর্কে তাদের সব বলেছেন । কিন্তু কেউই বুঝে উঠতে পারেনি, তাকে তাদের সান্ত্বনা দেওয়া উচিত না পরামর্শ ।

প্রায় ঘন্টাখানেক পরে সুনীল স্যার সুব্রতকে কল করলেন । তিনি যা বললেন তার মর্মার্থ করলে দাঁড়ায়, আমেরিকার একটি বিখ্যাত হসপিটালে সুনীল স্যার সব কাগজপত্র পাঠিয়ে একজন বিখ্যাত ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সেই ডাক্তার এবং হসপিটাল সুনন্দার চিকিৎসা করতে রাজি হয়েছে একটি শর্তে । শর্তটি হলো সুনন্দাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে আমেরিকায় নিয়ে আসতে হবে, তারপরে সব তাদের দায়িত্ব ।

সুনীল স্যার সুব্রতর অফিসের সঙ্গেও কথা বলে নিয়েছেন । সুনন্দার সমস্ত রকম চিকিৎসার দায়িত্ব, যাওয়া-আসার খরচ তারা দিতে রাজি । বাকি সুব্রতকে কথা বলে নিতে হবে এখানকার হসপিটাল সুনন্দাকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে আমেরিকার যাওয়ার ব্যবস্থা তারা করে দেবে কিনা । তারা রাজি হলে এখানকার হসপিটালের সঙ্গে তিনি কথা বলিয়ে দেবেন ।

সুব্রত কি বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না । সুনীল স্যার তাকে তাড়া দিয়ে বললো, “আমাদের সময় নেই সুব্রত, এখুনি গিয়ে হসপিটাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলো আর আমায় জানাও । ধন্যবাদ এবং যা যা দেওয়ার আছে আমেরিকায় এসে দিয়ো । গো এন্ড হারি আপ ।“ সুব্রত যতক্ষণ কথা বলছিলো শম্পা এবং সুনন্দার মা অধীর আগ্রহে সব কথা বোঝার চেষ্টা করছিলো । কথা শেষ হতেই শম্পা এগিয়ে এলো । সুব্রত তাকে সব জানালো ।

কন্যাদান

শম্পা আবার সুনন্দার মাকে সব জানাতেই বিশ্বনাথবাবু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন । সুনন্দার মা তাকে বাধা দিয়ে সুব্রতকে বললেন, “বাবা আমার মেয়েকে তুমি বাঁচাও । যা যা করার তুমি করো, আমি তোমাকে সুনন্দার মা হিসাবে সেই অধিকার দিচ্ছি । তুমি শুধু আমার মেয়েটাকে বাঁচাও । আমার মেয়ে হিসাবে নয়, তোমার স্ত্রী হিসাবে সুনন্দাকে বাঁচাও আর বেঁচে গেলে তোমার কাছেই রেখো তোমার স্ত্রী হিসাবে ।“ সুব্রত কি বলবে বুঝতে পারছিলো না, তার চোখের কোণ বেয়ে জল পড়ছিলো । শম্পা তার পিঠে হাত রেখে তাকে সামলাতে সাহায্য করছিলো । সুব্রত নিজেকে সামলে নিয়ে সুনন্দার মাকে একটা প্রণাম করলো । সুনন্দার মা তার মাথায় স্নেহের হাত রেখে বললেন, “আজ থেকে আমার মেয়ে তোমার স্ত্রী, তুমি যে করেই হোক তাকে বাঁচাও ।“

সুব্রত আর শম্পা চলে গেলো হসপিটাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে । তারা শুধু বললো, যদি সুনন্দার বাড়ির লোক আইনী কাগজপত্রে সই করে দেয়, তাহলে তাদের তরফে কোন আপত্তি নেই । তারা কাগজপত্র তৈরী করে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে, এর মধ্যে সুব্রত যেন আমেরিকার হসপিটাল বা ডাক্তারের সঙ্গে তাদের কথা বলবার ব্যবস্থা করে দেয় । সুব্রত সেইমতো সুনীল স্যারকে সব জানিয়ে দিলো ।

পড়ুন ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের "ভালোবাসার গল্প"


সব কিছু যেন ঝড়ের মতো হতে লাগলো । আমেরিকার ডাক্তার সুনন্দার চিকিৎসার দায়িত্বে যে ডাক্তার আছেন তার সঙ্গেও কথা বলেছেন, হসপিটাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেছেন এবং বলে দিয়েছেন কিরকম ব্যবস্থা করে সুনন্দাকে পাঠাতে হবে । সুব্রতর অফিস থেকে সব ব্যবস্থা-এমনকি একজন মেডিক্যাল অ্যাটেন্ডেন্ট, যে যাবে সুনন্দার সঙ্গে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে, আবার সেখানে হসপিটালে ভর্তি হয়ে গেলে সে ফিরত আসবে, তারও যাওয়া-আসারও ব্যবস্থা করে দিয়েছে ।

সুনন্দার মা বিশ্বনাথবাবুকে কাগজপত্রে কোন সইসাবুদ করতে দেননি, হসপিটালের কাগজপত্রে সব সুব্রত সই করেছে, সুনন্দার স্বামী হিসাবে । আর এর ফলে বিদেশে গিয়ে তার চিকিৎসার সুবিধাও হবে । যদিও তারা সেসব ভেবে কিছু করেননি, তার মা আবেগে “সুনন্দার সমস্ত দায়িত্ব সুব্রতর” বলে তাকে দিয়ে সই করিয়েছেন ।

দু’দিন লেগে গেছে সব ব্যবস্থা করতে । দু’দিন বাদে সুব্রত সুনন্দাকে নিয়ে চলে যাচ্ছে আমেরিকায় । সবাই এসেছে এয়ারপোর্টে, সুনন্দার মা, বাবা, শম্পা, সুব্রতর মা-বাবা, সুনন্দার আরো কয়েকজন আত্মীয় । সুনন্দাকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছেছে এয়ারপোর্টে । সঙ্গে রয়েছে হসপিটালের তরফে একজন মেডিক্যাল অ্যাটেন্ডেন্ট এবং সঙ্গে আরো দু’জন ।

তারা তিনজন মিলে সুনন্দাকে তৈরী করবে ফ্লাইটে যাওয়ার জন্যে । তারপরে দু’জন ফিরে যাবে । সবাই মিলে সুনন্দাকে দেখে নিলো । সুনন্দার মা বেশ কিছুটা কান্নাকাটি করলেন । তারপরে সুব্রতর হাত ধরে বললেন, “এখন থেকে তুমি ছাড়া ওর আর কেউ নেই, তুমি ওকে দেখো আর আমাদের খবর দিও । আর পারলে আগের সব কিছুর জন্যে আমার স্বামীকে ক্ষমা করে দিও ।“ সুব্রত তাকে প্রণাম করে এগিয়ে গেলো সুনন্দাকে নিয়ে । বিশ্বনাথ বাবু শুধু দূর থেকে সব কিছু দেখলেন ।

সব ফিরে পাওয়া 

দেখতে দেখতে আট বছর কেটে গেছে । সুব্রত, সুনন্দা আর তাদের একমাত্র মেয়ে সুনীতি আজ ফিরছে মুম্বইতে । সুব্রত দায়িত্ব পেয়েছে তাদের মুম্বই অফিসের সি.ই.ও হিসাবে । অফিস তাদের ফ্ল্যাট, গাড়ি সব দিচ্ছে । আর ঠিক একমাস পরে সুনীতির পাঁচ বছরের জন্মদিন ।

একমাস পরে সুনীতির জন্মদিনে সুনন্দার মা-বাবা, শম্পা-শম্পার স্বামী, সুব্রতর বাবা- মা সবাই সুব্রতদের মুম্বইয়ের ফ্ল্যাটে উপস্থিত হয়েছে । সুনন্দা তার মা-বাবা ঢুকতেই তাদের জড়িয়ে ধরেছে । আসলে আমেরিকায় চিকিৎসার পরে তার দুর্ঘটনার কথা একদমই মনে নেই । সে শুধু সেটাই জানে, সুব্রত আর সুনীল স্যার তাকে যা বুঝিয়েছে । তার সুব্রতর সঙ্গেই বিয়ে হয়েছ এবং বিয়ের পরে সুব্রত তাকে নিয়ে আমেরিকায় চলে আসে । তার শরীর খারাপ হয়েছিলো, তাই তাকে হসপিটালে ভর্তি করতে হয়েছিলো । তাদের একমাত্র মেয়ে সুনীতি আর সুব্রতকে নিয়ে সে সুখে-আনন্দে সংসার করেছে । এতোদিন ধরে সে ফোনে বাবা, মায়ের সঙ্গেও কথা বলেছে । তারাও তাকে কিছু বুঝতে দেননি, আর তারও কিছু মনে নেই ।

বিশ্বনাথবাবু সারাদিন তার নাতনীকে নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন । পরদিন সুনীতির জন্মদিনে অনেক মানুষ উপস্থিত হলো । সুনন্দার বাবা, মা, সুব্রতর বাবা, মা, শম্পারা তো ছিলোই, তাছাড়াও সুনীল স্যার আর তার পরিবার, সুব্রতর অফিসের লোকজন, সুব্রতর আরো কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব ।

সবাইয়ের সঙ্গে সুনন্দা আনন্দে হইচই করছে, হাসি-খুশি মুখে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সবার সঙ্গে কথা বলছে । সেই সময় বিশ্বনাথবাবু সুব্রতকে একবার একা পেয়ে সুব্রতর দুটি হাত ধরে চোখের জল মেশানো গলায় বললেন,সুব্রত পারলে আমায় ক্ষমা করে দি্ও । তোমার ভালোবাসাকে আমি অসম্মান করেছি, কিন্তু তুমি আমার মেয়েকে জীবনে একটা সঠিক পরিণতি দিয়েছো ।“

 

 আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন - "গল্পের ঝুলি"তে

গল্প পড়ে কেমন লাগলো অবশ্যই জানাবেন, আপনার কিছু একটা কমেন্ট আপনার উপস্থিতি জানান দেয়, জানায় যে, আপনারা সঙ্গে আছেন । যা আমায় উৎসাহিত করে জীবনের দৈনন্দিতার ফাঁকে ফাঁকে নতুন করে কিছু ভাবার, কিছু লেখার । আশাকরি, সঙ্গে থাকবেন ।এই গল্পের সমস্ত চরিত্র, কাহিনী, স্থান সমস্ত কিছই কাল্পনিক, বাস্তবের সঙ্গে এর কোন মিল খুঁজবেন না ।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন