মর্মস্পর্শী বাংলা গল্প : পড়ন্ত শীতের বিকেল । রোদ্দুরটা যেন একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, জানালা দিয়ে ঢুকে পড়েছে একাকী অরুণ দেবনাথের  ড্রইংরুমে । অরুণের বয়স আটচল্লিশ ছুঁই-ছুঁই । চুলে পাক ধরেছে ভালোভাবেই, চশমার ফ্রেমটা চোখের নিচের কালো দাগগুলোকে হালকা হলেও বেশ ঢেকে রেখেছে । নামী সফটওয়্যার কোম্পানির চাকরি, বড় পৈতৃক বাড়ি, গাড়ি – সবই আছে ।  তবুও অরুণের মনটা যেন আজকাল খাঁ খাঁ করে । আজকাল প্রায়ই হয় ।  বিশেষ করে বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে । আজ প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেল ।

একটি মর্মস্পর্শী বাংলা গল্প - বাবার সাইকেল | “গল্পের ঝুলি”

অরুণ ও তার বাবা

আসলে অরুণের জীবনটাই এইরকম । চাকরি পাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মা চলে গেলেন তাদের ছেড়ে চিরকালের মতো । তারপর থেকেই বাবা আর সে । রান্নাবান্না আর বাকি কাজের জন্যে লোক রয়েছে । তবুও সে চলে যাওয়ার বাবা প্রায় একাই থাকতেন বই পড়া, বাগান করা আর টুকটাক কাজ নিয়ে । একদিন বাবা রাতে খেতে বসে তাকে বললেন, “অরুণ এবারে তুই একটা বিয়ে কর । যদি বলিস, আমি মেয়ে দেখবো তাহলে দেখা শুরু করতে হবে, আর তোর যদি কাউকে পছন্দ থাকে তাহলে বল, আমার কোনদিক থেকে কোন আপত্তি নেই ।“

আসলে অরুণের সঙ্গে তার বাবার সম্পর্ক ছিলো বন্ধুর মতো, খোলামেলা । অরুণ বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, “আমাদের অফিসে শ্রাবণী বলে একটা মেয়ে আছে, তাকে আমার খুব ভালো লাগে । কিন্তু এইসব ব্যাপারে তার সঙ্গে আমার কোনরকম কথা হয়নি । জানি না সে আমাকে পছন্দ করবে কিনা ।“ অরুণের বাবা বললেন, “তোর আর কথা বলে কাজ নেই, আমাকে তুই তার ঠিকানাটা যোগাড় করে দে । আমি তার বাবা-মার সঙ্গে কথা বলে নেবো ।“

অরুণের বাবা সত্যিই তাই করলেন । অরুণের থেকে ঠিকানা নিয়ে হাজির হলেন শ্রাবণীদের বাড়িতে । শ্রাবণী বা তার বাবা-মায়ের কোন আপত্তি ছিলো না । তাই অরুণ আর শ্রাবণীর ধূমধাম করে বিয়ে হয়ে গেলো ।

শ্রাবণী ঘরে আসার পরে অরুণের বাবা শ্রাবণীকে ঘরের, তার মায়ের আলমারীর সমস্ত চাবি হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “আজ থেকে এই সম্পত্তি-সংসার সব তোমাদের । তুমি যা চাইবে তাই হবে । তুমি যদি মনে করো চাকরী করবে-তাহলে করবে । তোমার ইচ্ছা বা স্বাধীনতার উপর আমি কোন খবরদারী করবো না । তুমি স্বাধীন । তুমি কখনোই এই বাড়িকে শ্বশুরবাড়ি ভাববে না, এটা তোমার বাড়ি । আমি এই বাড়ির কাগজ-পত্রও অরুণের নামে করে রেখেছি ।“

শ্রাবণী সত্যিই সব গুছিয়ে নিয়েছিলো । সে চাকরী করার সঙ্গে সঙ্গে সংসার, অরুণের বাবার দেখাশোনা-যত্ন প্রতিটা ব্যাপারে নিখুঁত ছিলো । বাড়ির কাজের লোক থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে তার দারুণ সদ্ভাব তৈরী হয়ে গিয়েছিলো ।    

কিন্তু অরুণের বোধহয় কপালটাই ছিলো হারানোর । সংসার সুখ মনে হয় তার জন্যে মনে হয় বেশিদিন ছিলো না । বিয়ের বছর তিনেকের মধ্যেই তাদের কোন সন্তান হওয়ার আগেই শ্রাবণীর দুরারোগ্য ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়লো । আর তার দু’ই বছরের মধ্যে অরুণের জীবনে সব কিছু ওলট-পালট হয়ে গেলো । প্রচুর চিকিৎসা, প্রচুর প্রচেষ্টার পরেও শ্রাবণীকে বাঁচানো গেলো না ।

শ্রাবণীর মৃত্যুর পর সব থেকে বেশি ভেঙে পড়লেন অরূণের বাবা । তার মনে হয়, কারণও ছিলো । নার্স, আয়া থাকা সত্ত্বেও অরুণ অফিস চলে যাওয়ার পরে শ্রাবণীর শয্যাশায়ী অবস্থায় অরুণের বাবা শ্রাবণীর মেয়ের থেকেও বেশি যত্ন নিতেন । শয্যাশায়ী হয়ে যাওয়ার পরে শ্রাবণীর বাবা-মা তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন । কিন্তু শ্রাবণী যেতে চায়নি, সে অরুণের বাবার হাত ধরে অনুরোধ করেছিলো, শেষ কয়েকটা দিন তাকে তাদের কাছে রাখার জন্যে । অরুণের বাবাও সেইজন্য শ্রাবণীর বাবা-মাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন । তবে শ্রাবণীর বাবা-মা এসে দেখে গিয়েছিলেন এবং স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে অরুণের বাবা শ্রাবণীর যে যত্ন-খেয়াল নেন, তা হয়তো তারাও পারতেন না । আর শ্রাবণীর ভাগ্য-বিপর্যয়ের জন্যে তার মা ফেলে গিয়েছিলেন চোখের জল ।

শ্রাবণী চলে যাওয়ার পরে অরুণ ধীরে ধীরে আবার অফিস-কাজকর্মের মধ্যে ফিরে গেলেও অরুণের বাবা আর জীবনে ফিরতে পারেননি । সারাদিন তিনি ঘরেই বসে থাকতেন, ঘর থেকে বেরোতেন না । তার বাগানে অযত্নে আগাছায় পরিপূর্ণ হলো, ফুলগাছ সব শুকিয়ে গেলো । তিনি সারাদিন ঘরে বসে বই পড়তেন আর অরুণের বিয়ের, আর তাদের বাকি অ্যালবাম দেখতেন । তারপরে একদিন স্ট্রোকে প্যারালাইসিস হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন । তাকে সারাক্ষণ দেখাশোনা করার জন্য অরুণ নার্স, আয়া রেখে দিয়েছিলো । রাতের বেলা অফিস থেকে ফিরে অরুণ যখন তার বাবার কাছে এসে বসতো, খোঁজখবর নিতো, তখন সে দেখতে পেতো বাবার চোখে জল । কিন্তু বাবা তাকে আর কোনদিন বিয়ের কথা বলেননি ।

সাইকেল খুঁজে পাওয়া

আসলে শনি, রবিবার অরুণের অফিস ছুটি । বাড়িতে সারাদিন তার বড় একা, ফাকা লাগে । কিন্তু আজ শনিবার অফিসের ছুটির দিনে যেন অরুণের মনটা যেন বড্ড বেশি খাঁ খাঁ করছে । বড় বেশি ফাঁকা লাগছে সব কিছু । হঠাৎ তার চোখ পড়লো তাদের গুদামঘরের তালাটায় । সেই পুরনো তালাটা, মরচে ধরে গেছে । অরুণের মনে হলো, গুদামঘরের ভেতর থেকে তাকে কেউ যেন ডাকছে ।  অরুণ উঠে দাঁড়ালো । চাবিটা খুঁজতে খুঁজতে বাবার ঘরে বইয়ের তাকে একটা পুরনো টিনের বাক্সের তলায় পাওয়া গেলো । তালাটা খুলতে একটু জোর লাগলো । গুদামঘরের গন্ধ তার নাকে লাগলো – পুরনো কাগজ, ন্যাপথলিন, আর ধুলোর মিশ্রণে তৈরী একটা ভ্যাপসা, বোঁটকা গন্ধ ।

ভেতরে নানারকম জঞ্জালের স্তূপ । পুরনো ট্রাঙ্ক, ভাঙা ফ্রেম, ভাঙা ফার্নিচার আর অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আড়ালে দেওয়ালের একটা কাপড়ের ঢাকনা দেওয়া একটা জিনিস । কাপড়টায়  টান দিতেই একগাদা ধুলো উড়লো । আর তার নিচে থেকে বেরোলো ... বাবার পুরানো সাইকেল !

একটা পুরনো হিরো সাইকেল । কালো ফ্রেম, কিন্তু এখন মরচে পড়ে প্রায় লালচে বাদামী রঙের হয়ে দাঁড়িয়েছে । সীটটার চামড়া ফেটে স্পঞ্জ বেরিয়ে পড়েছে । চেনটা ঝুলে পড়েছে, টায়ারগুলো ফেটে চুপসে আছে । হ্যান্ডেলের রাবার গ্রিপগুলো পুরানো হয়ে খসে পড়েছে, ধাতব অংশগুলো দেখা যাচ্ছে । পেছনের স্ট্যান্ডটা ভেঙে নীচে পড়ে আছে । একসময়ের সর্বদা পালিশ করা, শান দেওয়া, ঝকঝকে সাইকেলটা এখন জঞ্জালের মতো পড়ে রয়েছে । একা, কেউ যত্ন নেওয়ার নেই । অরুণের মনটা খারাপ হয়ে গেলো ।

পড়ুন - ভালোবাসার গল্প : অঙ্গীকার

অরুণ ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেলটা স্পর্শ করলো । ঠাণ্ডা, রুক্ষ । হ্যান্ডেলটা স্পর্শ করতেই হঠাৎ যেন অরুণের শরীরে একটা বিদূতের ঝলক বয়ে গেলো আর চোখের সামনে একটা স্মৃতির ছবি যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল – বাবা ! এই হ্যান্ডেলটা ধরে সাইকেল চালাচ্ছেন, সামনের ছোট্ট সীটটায় ছোট অরুণ বসে, পিছনের ক্যারিয়ারে বাজারের ঝুলি । বাবার সারা গায়ে একরাশ ঘাম, কিন্তু মুখে চোখে অদ্ভুত একরাশ স্নেহভরা, স্নিগ্ধ হাসি ।

ছবিটা ভেসে ওঠা মাত্রই অরুণের মাথায় কে যেন বলে উঠলো, “সাইকেলটা মেরামত করতেই হবে ।“ গুদাম ঘর থেকে সাইকেলটাকে বের করে অরুণ নিয়ে এলো বারান্দায় । একটা পুরানো কাপড় আর নারকেল তেল দিয়ে ঘষে ঘষে শুরু করলেন জং তোলা । তার প্রতিটা ঘষায় যেন অতীতের-স্মৃতির একেকটি আবরণ সরে যেতে লাগলো ।    

ফ্ল্যাশব্যাক ১ : সাইকেল শেখার  দিনগুলো

"সাবাস অরুণ! একদম সোজা তাকা ! পা চালা... আরেকটু!" 

দশ বছর বয়সী অরুণ, টলটল করে কাঁপছে সাইকেলের্উপরে বসে আর তার বাবার শক্ত হাত সিটের পিছনে ধরে আছে। রাস্তাটা তখন কাঁচা, গলির মোড়ে । অরুণ টলটল করতে করতে সামনে এগোচ্ছে আবার ভয়ে চোখ বুজে ফেলছে । "চোখ খোল অরুণ ! সামনে দ্যাখ!" বাবার কণ্ঠে উৎসাহ । কখন হঠাৎ বাবার হাত ছেড়ে দিয়েছেন অরুণ জানতেও পারেনি । বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ বাবার গলার আওয়াজ না পেয়ে লাফিয়ে সাইকেল থেকে নেমে পিছন ফিরে দেখে বাবা দূরে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছেন, মুখে বিজয়ীর হাসি । সেই প্রথম অরুণ পেলো জেতার অনুভূতির, বাধাকে অতিক্রম করার স্বাদ ।

ফ্ল্যাশব্যাক ২ : অফিসের পথে

কড়া রোদ। অরুণ ক্লাস এইটে পড়ে। বাবার সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে বসে। বাবা তাকে স্কুলে দিয়ে নিজে অফিসে যাবেন। বাবার গায়ের গন্ধ – সস্তা সাবান আর ঘামের মিশ্রণ । বাবার শার্টের পিঠটা ভিজে গেছে ।

"বাবা, আজ বড্ড গরম।" 

"হ্যাঁ রে, আজ প্রচন্ড গরম পড়েছে । আচ্ছা তোর হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার ফল কবে?" 

"আগামী সপ্তাহে বাবা ।" 

“আমি জানি তুই ভালোই করবি, ভালোই তো করিস । তুই কোন চিন্তা করবি না । তুই শুধু পড়া চালিয়ে যা । এই সাইকেলের ভরসাতেই আমি তোকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনীয়ার বানাবো” । বাবার সেই কথায় অরুণ আত্মবিশ্বাস পেতো, সাহস পেতো, ভরসা পেতো ।

ফ্ল্যাশব্যাক ৩ : মায়ের জন্য ফুল

অরুণের বয়স তখন ষোল । হঠাৎ একটা রবিবারে বাবা অরুণকে ডাকলেন, “আয়, বাজারে যাবো” ।

“কেন বাবা ?”

“তোর মায়ের জন্য কিছু ফুল কিনবো, তুই সঙ্গে চল” ।

বাজারে গিয়ে এক ফুলওয়ালার সঙ্গে দরদাম করে একগুচ্ছ গোলাপ কিনলেন ।

সাইকেলে ফেরার সময় বাবা অরুণকে বলেছিলেন, “অনেক সময় বড় জিনিস, বড় দামের জিনিসও ভালোবাসা বোঝাতে পারে না । ছোট ছোট ভালোবাসাই জীবনে বড় হয়ে দাঁড়ায় “। অরুণ তাকিয়ে সাইকেলের সামনের হ্যান্ডেলে বসে দেখেছিলো, বাবার মুখে ছিলো এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি । ফুলগুলো মাকে এসে দেওয়ার পরে মা-ও খুব খুশি হয়েছিলেন । অরুণ পরে জানতে পেরেছিলো, সেইদিনটা ছিলো বাবা মায়ের বিবাহবার্ষিকী ।

নতুন করে ফিরে পাওয়া

ভালো করে ঝেড়ে মুছে সাইকেলটাকে ঘষে ঘষে অরুণ নিয়ে গেলো কাছের একটা সাইকেলের দোকানে । দোকানদারকে নির্দেশ দিলেন, “একবারে নতুনের মতো করে দাও । টাকা যা লাগবে দেবো”।

পরের শনিবার সেই দিনটা এলো । যখন সাইকেলের দোকানদার সকালবেলায় সাইকেলটাকে নিয়ে এসে দাড় করালো অরুণবাবুর বাড়ির উঠানে । নতুন কালো রং ঝকঝক করছে, নতুন টায়ার, মতুন চকচকে স্পোক । হ্যান্ডেল কভার, সিট কভার সব নতুন ঝকঝক করছে । অরুনবাবু খুশি হয়ে দোকানদার যা চাইলো, কোনরকম বাক্যব্যয় না করে তাকে সেই টাকাই দিয়ে দিলেন । সে খুশি মনে ফিরে গেলো । অরুনবাবু সাইকেলটার কাছে এসে দাঁড়ালেন । নতুন ঝকঝকে বেলটা বাজালেন – “ট্রিন...ট্রিন...ট্রিন...” যেন অবিকল সেই পুরানো শব্দটাই ।

পরম মমতায় অরূণবাবু সাইলেটার গায়ে হাত বোলালেন । নতুন সাইলেটাকেই আবার পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছলেন । তারপরে ধীরে ধীরে বারান্দায় সাইকেলটাকে তুলে রাখলেন ।

বিকাল হতেই অরুণবাবু সাধারণ হাফ শার্ট আর প্যান্ট পরে, পায়ে স্যান্ডেলটা গলিয়ে সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন । সীটে উঠে প্রথম প্যাডেলটা মারার সময় একটু ভয় ভয় করছিলো তার । এতো বছর পরে চালাবেন । প্রথমটায় একটু টলমল করে তিনি সাবলীল হয়ে উঠলেন ।

উদ্দেশ্যহীন, গন্তব্যহীনভাবে তিনি চালিয়ে যেতে লাগলেন । পায়ের পেশীতে একটা সুপরিচিত ব্যথা অনুভব করলেন, কিন্তু তা তার ভালোই লাগলো । এতোদিন তিনি গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময়ে যা হয়তো দেখেও দেখেনননি সেগুলোই দেখতে পেলেন । রাস্তার ধারে ফুটে থাকা গাঁদাফুল, টগরফুল, আরো কতরকমের ফুল । কিছু বুড়ো মানুষ গাছের নীচে বসে তাস খেলছিলো । মায়ের হাত ধরে শিশু প্রাইভেট টিউশনি পড়তে যাচ্ছে । কোথাও শিশুরা হৈ-হুল্লোড় করে খেলছে ।

পড়ুন - বাংলা প্রেমের গল্প : পরিণতি

একটা বড় মাঠের সামনে এসে তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন । সেখানে ছেলেরা ফুটবল খেলছে । তিনি কিছুক্ষণের জন্য তার ছেলেবেলার খেলার মাঠে পৌছে গেলেন । আবার সাইকেলটা চালিয়ে এসে তিনি এসে বসলেন গঙ্গার ধারে । সেখানে বসে বসে তার মনে হলো এত বছর ধরে তিনি যা ভুলে গিয়েছিলেন, আজ সাইকেলটা যেন মনে করিয়ে দিলো – তার বাবার সহজ সরল মুক্ত জীবনদর্শন । কষ্টকে স্বীকার করে নেওয়া, দায়িত্ব নেওয়া, ছোট ছোট আনন্দকে পালন করা, অন্যের সাথে ভাগ করে নেওয়া । তার বাবা কোনদিন বিলাসিতার পেছনে ছোটেননি । তিনিই কৃত্রিমতার জালে জড়িয়ে পড়িয়েছিলেন – ক্যারিয়ারের চাপ, উচ্চাশা, বস্তুগত সম্পদের দিকে ছুটছিলেন । আর নিজেকে হারিয়ে ফেলে হতাশ হয়ে পড়ছিলেন ।

অরুনবাবু উঠে দাঁড়ালেন । সাইকেল চালিয়ে ফিরে এলেন বাড়ির দিকে । তার বাড়ির থেকে বেশ কিছুটা দূরে তাদের পুরানো ক্লাব । তিনি সাইকেলটা নিয়ে ক্লাবের সামনে দাঁড়ালেন । ক্লাবের সেক্রেটারী তাকে চিনতো । তার নাম বাবলু । সে খাতির করে তাকে ক্লাবের ভেতরে নিয়ে গিয়ে বসালো । অরুণবাবু তাকে বললেন, “তুমি তো আমাকে চেনো । আচ্ছা আমাকে বলো তো আশেপাশে এইরকম কতোজন ছাত্র থাকতে পারে যারা পয়সার অভাবে টিউশন পড়তে পারছে না?” বাবলু বললো “হ্যাঁ স্যার এরকম তো অনেকেই আছে । পড়াশোনায় বেশ ভালো, কিন্তু পয়সার অভাবে টিউশন পড়তে পারে না । মাধ্যমিক আর উচ্চ-মাধ্যমিক মিলিয়ে জনা-কুড়ি তো হবেই । কেন বলুন তো স্যার?”

অরূনবাবু বললেন, “প্রতি শনিবার আর রবিবার আমি ওদের বিনা পয়সায় বিজ্ঞান বিভাগ পড়াবো । তুমি ক্লাবে সব ব্যবস্থা করো ।“ বাবলু আনন্দের সঙ্গে বললো, “সে তো দারুণ হয় স্যার, ক্লাবের তরফ থেকে কোন অসুবিধা নেই, আপনি সামনের শনিবারই সবাইকে পেয়ে যাবেন, আমি সব ব্যবস্থা করে রাখবো স্যার ।“ অরুনবাবু ফিরে পেলেন জীবনের উদ্দেশ্য, বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য, নতুন করে পথ চলার উদ্দেশ্য ।

শুরু হলো অরুণবাবুর নতুন জীবন । প্রতি শনিবার আর রবিবার তিনি সাইকেল চালিয়ে সকাল বিকাল ক্লাবে যাতায়াত করতেন আর আশেপাশের গ্রামের ছেলে মেয়েদের বিনামূল্যে পড়াশোনা শেখাতে শুরু করলেন । নতুন ডাক্তার-ইঞ্জিনীয়ার তৈরীর স্বপ্ন নিয়ে শুরু হলো অরুণবাবুর সাইকেলের নতুন যাত্রা ......

 

গল্প পড়ে কেমন লাগলো কমেন্ট করে জানাবেন । গল্প পড়ে ভালো লাগলে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শীদের শেয়ার করবেন । আপনাদের কমেন্ট আমাদের নতুন কিছু ভাবতে, নতুন কিছু লিখতে উদ্বুদ্ধ করে । আমাদের উদ্বুদ্ধ করা চালিয়ে যাবেন । “গল্পের ঝুলি” পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ।

 


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন