বাংলা প্রতিশোধের গল্প
গোবিন্দপুর নামের এক অজ পাড়া-গাঁ । গঙ্গার কোল জুড়ে থাকা এই গ্রামে জীবন চলত ঋতুচক্রের মতোই নিয়মিত, সুন্দর ছন্দে । কিন্তু শহরের নির্মম ব্যবসায়ী বিক্রম সিংহরায়ের লোভী দৃষ্টি পড়ল গ্রামের উর্বর জমি ও নদীসংলগ্ন বন্দরনামা অবস্থানের জন্য ।
নদীর কূল ভাঙার শব্দের মতোই করুণ ছিল গোবিন্দপুর গ্রামের পতনের কাহিনী । বন্যায় সেই বছর গ্রাম তলিয়ে গেছে, মানুষ যখন আশ্রয়হীন-অসহায়, তখন বিক্রম সিংহরায় টাকার জোরে সরকারি দালাল দিয়ে জাল দলিল তৈরী করে দখল করে নিতে চাইলেন পুরো গ্রামের জমি ।
প্রতিবাদ করলেন আর্যশেখরের বাবা, গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিশ্বনাথ শর্মা । কোর্ট-কাছারী, সরকারী দপ্তর ঘোরাঘুরি করে তিনি বিক্রমের ইচ্ছার উপর রাশ টানতে সফল হওয়ার পথে এগোচ্ছিলেন । সেইসময় একরাতে বিক্রমের পাঠানো গুণ্ন্ডাদের লাঠির ঘায়ে তিনি প্রাণ হারালেন । আর্যশেখর দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিলো, তাকে আর কখনো গ্রামে দেখতে পাওয়া যায়নি । গুন্ডারা তাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলো । আগুন থেকে গ্রামবাসীরা বাঁচালেও, পায়ে চোট পেয়ে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলো আর্যশেখরের ছোট ভাই অনিকেত । তাদের মা শ্রীমতী গীতা শর্মা শোকে স্থবির হয়ে গিয়েছিলেন, কিছু বছর বাদে তিনিও মারা যান শোকে ।
সেদিন রাতের অন্ধকারে, গোবিন্দপুর গ্রামের সীমানার প্রান্তে, ভগ্ন মন্দিরের মূর্তির পাথরের বেদীতে হাত রেখে কিশোর আর্যশেখর শপথ নিয়েছিলো : "হে ঈশ্বর, এই শপথ যেন ভঙ্গ না হয় । আমি শুধু বিক্রমকে নয়, তার বংশকে নির্মুল করে ছাড়বো । সে যে বেদনা আমাকে, আমার পরিবারকে দিয়েছে, তার সহস্রগুণ তাকে আমি ফিরিয়ে দেবো ।"
অন্যদিকে, সন্ধ্যায় ড্রয়িংরুমে ড্রিঙ্কস নিতে নিতে বিক্রম সিংহরায় গোবিন্দপুর গ্রামের ঘটনার খবর পাওয়ার পরে নিজেকে বলছিলেন, “আর্ষশেখর ! আমি জানি এই ঘটনার পরে তুমি শীতল প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞা নিয়ে বাঁচবে । কিন্তু ঈশ্বর যেন তোমায় সুমতি দেন, কারণ অন্ধকার পথে যাত্রা করলে তুমি নিজেই একদিন অন্ধকারে হারিয়ে যাবে ।“
কুড়ি বছর পর...
সিংহরায় গ্রুপ এখন দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী হয়ে উঠেছে । বিক্রম সিংহরায় এখন মন্ত্রীদের সাথে ওঠাবসা করেন, গল্ফ খেলেন, টিভি চ্যানেলে তার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয় । কিন্তু তিনি জানতেন না, তারই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে দক্ষ ও বিশ্বস্ত কার্যনির্বাহী, রণবীর সাহা, আসলে আর্যশেখর, যে প্রতি রাত প্রতিশোধের স্বপ্নে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়, আর অপেক্ষা করে, নির্মম প্রতিশোধের-জাল বোনে বিক্রম সিংহরায় ও তার পরিবারকে ধ্বংস করার জন্যে ।
আর্যশেখরের রূপান্তর ছিল ভয়ানক। গোবিন্দপুর গ্রামের সেই সংস্কৃতিমনা ছাত্র এখন আইন ও ব্যবসায়িক কৌশলে পণ্ডিত, তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী, এবং ভয়ঙ্কর ধৈর্য্যশীল এক যুদ্ধাকাঙ্ক্ষী । সে বিক্রমের অফিসে ঢুকেছিলো একজন সাধারণ কেরানী হয়ে, আর আজ তার ডান হাত ।
"বাবা, রণবীরকে কিন্তু এতটা বিশ্বাস করা উচিত নয়," বিক্রমের ছেলে কবির সিংহরায় বলত, "তার চোখে কোনো উষ্ণতা নেই, কেবল হিসাব।"
"তুমি ঈর্ষান্বিত, কবির," বিক্রম হেসে উড়িয়ে দিতেন, "রণবীর যে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে, তুমি তা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না ।"
কবিরের সন্দেহ ভুল ছিল না । রণবীর তথা আর্যশেখরের ল্যাপটপে "অগ্নিশপথ" নামে একটি এনক্রিপ্টেড ফাইল ছিলো, যাতে সিংহরায় সাম্রাজ্য ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ ছিল ।
বিশ্বাসের জাল
আর্যশেখর বিক্রমের জীবন বাঁচিয়েছিল এক পার্বত্য দুর্ঘটনায়, আসলে যা দুর্ঘটনা ছিল না - ছিলো এক পরিকল্পিত নাটক । বিক্রমের গাড়ির ব্রেক লাইন কাটা ছিল, আর্যশেখর তথা রণবীর সঠিক সময়ে তাকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিক্রমকে রক্ষা করেছিল । সেদিন থেকেই বিক্রম তাকে পুত্রসম স্নেহ করতেন ।
কিন্তু বিক্রম জানতেন না, সেই ব্রেক লাইন কাটা হয়ে ছিলো আর্যশেখরেরই নির্দেশে । তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল এক একটি শিকলের মতো, যা ধীরে ধীরে বেঁধে ফেলছিল তার শিকারকে ।
দুর্বলতার শিকার
আর্যশেখর জানত, বিক্রমের দুর্বলতা তার দুই সন্তান : কবির – মাদকাসক্ত ও অদক্ষ, আর অদ্বিতীয়া – তার কলেজ পড়ুয়া কন্যা, যে বাবার ব্যবসায়িক নীতিকে ঘৃণা করে । আর্যশেখর ধীরে ধীরে কবিরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে, তার মাদকাসক্তিকে উৎসাহ দিয়ে, আর অদ্বিতীয়ার বিপ্লবী চিন্তাকে ব্যবহার করেছে প্রতিষ্ঠান ও বিক্রমের সংসারের ভিতরে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য ।
বিষের বীজ বপন
একটি ঝড়-বৃষ্টির রাতে, যখন অফিস প্রায় খালি, আর্যশেখর দেখল বিক্রম তার চেম্বারে বসে একটি পুরনো ডায়েরি পড়ছেন । আর্যশেখর সেই ডায়েরী চুরি করে পড়ে জানতে পারলো, তাতে বিক্রমের প্রেমিকা মালতীর কথা, যে গর্ভবতী ছিল যখন বিক্রম তাকে ত্যাগ করে অন্য এক ধনকুবেরের মেয়েকে বিয়ে করেন । পরের পৃষ্ঠায় ছিল তাদের এক শিশুপুত্রের কথা, যে জন্মের পরই মারা যায়।
আর্যশেখরের মনে প্রশ্ন জাগল : শিশুটি কি সত্যিই মারা গিয়েছিল? নাকি বিক্রম তাকে মেরে ফেলেছিলেন ?
এই সন্দেহ আর্যশেখরের পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করলো । সে একজন গোয়েন্দা নিয়োগ করল মালতীর খোঁজে । গোয়েন্দার রিপোর্টে উঠে এল অবিশ্বাস্য তথ্য : মালতীর শিশু বেঁচে ছিলো, তাকে একটি অনাথাশ্রমে দেওয়া হয়েছিল, তারপর তাকে দত্তক নেওয়া হয় এক মধ্যবিত্ত পরিবারে । তার নাম এখন অনির্বাণ, যে আজ একজন সফল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ।
নাটকের নতুন মুখ
আর্যশেখর ধীরে ধীরে পরিকল্পনা করে অনির্বাণের সংস্পর্শে এলো । ধীরে ধীরে সে তার বিশ্বাস অর্জন করলো । একদিন এক লেকের ধারে বসে আর্যশেখর বলল, "তোমার পিতা একজন শিল্পপতি, যে তোমাকে ত্যাগ করেছিলেন।"
অনির্বাণ প্রথমে বিশ্বাস করতে চাইল না, কিন্তু আর্যশেখর যখন তার জন্মরহস্য জানতে চাওয়ার জন্য ডি.এন.এ টেস্টের প্রস্তাব দিল, সে রাজি হয়ে গেল । টেস্ট প্রমাণ করল, বিক্রমই তার জৈবিক পিতা ।
"কিন্তু তিনি কেন আমাকে ত্যাগ করেছিলেন?" অনির্বাণের কণ্ঠে ছিলো বেদনা ও ক্রোধ ।
"সম্পদ এবং ক্ষমতার জন্য," আর্যশেখর মিষ্টি বিষের মতো কথাগুলো বলল, "তুমি তার জীবনের এক কুৎসিত সত্য, যে সত্য তিনি চাপা দিয়ে দিতে চেয়েছেন ।"
প্রতিশোধের বহুরূপী নাটক
আর্যশেখরের পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায় পৌঁছাল । সে তিন দিকে তিনটি আঘাত হানলো –
এক, সিংহরায় গ্রুপের সবচেয়ে বড় সরকারি চুক্তি, যা এক সময় আর্যশেখর নিজেই নেগোশিয়েট করেছিল, সেটি হস্তান্তরিত করলো প্রতিযোগী কোম্পানির কাছে, গোপনে প্রাপ্ত কমিশনের বিনিময়ে ।
দুই, বিক্রমের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে বড় অঙ্কের টাকা সুইস ব্যাঙ্কে পাচারের প্রমাণ গণমাধ্যমে ফাঁস করে দিলো আর্যশেখর ।
তিন, কবিরের সঙ্গে মাদক চোরাচালানের সংযোগ দেখিয়ে সে প্রকাশ করে দিলো পুলিশের কাছে ।
কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাত হানল সে অনির্বাণকে দিয়ে । এক পারিবারিক অনুষ্ঠানে অনির্বাণ হাজির হয়ে নিজেকে বিক্রমের পুত্র হিসেবে ঘোষণা করল, দাবি করল সম্পত্তিতে তার অধিকার ।
অনির্বাণের কথা শুনে বিক্রমের স্ত্রী ত্রিপুরা দেবী মূর্ছা গেলেন । বাকি অতিথিরা আর অদ্বিতীয়া হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ।
"তুমি... তুমি আমার ছেলে?" বিক্রম সিংহরায় প্রায় রুদ্ধ কন্ঠে বললেন ।
"হ্যাঁ, যে ছেলেকে আপনি মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন," অনির্বাণ বলল আর্যশেখরের শেখানো সংলাপ, "আজ আমি ফিরে এসেছি আমার অধিকার নিতে ।"
পড়ুন - বাংলা প্রেমের গল্প : পরিণতি
পরিকল্পনার বিপর্যয়
কিন্তু এতো কিছুর পরেও আর্যশেখরের পরিকল্পনা অন্য দিকে মোড় নিলো । কারণ, বিক্রম সিংহরায় স্বীকার করে নিলেন, যদি সত্যিই অনির্বাণ মালতীর সন্তান হয়, তাহলে তিনি তাকে সম্পত্তি প্রদান করবেন । শুধু তার জন্যে কিছু সময় দরকার সমস্ত কিছু যাচাই করে নেওয়ার জন্যে, আইনগত কার্যপ্রণালীর জন্যে ।
আর এরই মধ্যে, আর্যশেখরের পরিকল্পনা যে পথে চলছিল, তার বাইরে অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়ালো । অনির্বাণের সাথে অদ্বিতীয়ার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে উঠলো । দুই ভাইবোন, যোগাযোগ করতে লাগলো একে অপরের সঙ্গে । আর্যশেখর যখন তা টের পেল, তখন খুব দেরি হয়ে গেছে ।
অদ্বিতীয়া অনির্বাণকে বিশ্বাস করাতে পেরেছিলো, "তোমার কথায় আমি বিশ্বাস করি না। বাবা নিষ্ঠুর হতে পারেন, কিন্তু তিনি শিশুহত্যা করাতে পারেন না।"
এদিকে, বিক্রম সিংহরায় তখন প্রায় সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে । সিংহরায় গ্রুপ পতনোন্মুখ। কবির জেল খাটছে ।
অনির্বাণ আবার সন্দিহান হলো তার জন্মরহস্য নিয়ে । সে গোপনে তদন্ত শুরু করলো । সে মালতীর খোঁজ পেলো, যে এখন একজন ক্যান্সার রোগী এবং মৃত্যুশয্যায় । মালতী অনির্বাণের কাছে স্বীকার করলো, যে তার গর্ভের শিশু সত্যিই মারা গিয়েছিল জন্মের সময় । বিক্রম তাকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন, কিন্তু মালতী সেই টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়, আরেক শিশুকে দত্তক নিয়ে তাকে বিক্রমের সন্তান বলে চালানোর ষড়যন্ত্র করতে চায়, কিন্তু সফল হয় না ।
"কিন্তু সেই শিশুটি... সে তুমি নও," মালতীর শেষ নিশ্বাসের সময় বলা কথা, "তুমি সম্পূর্ণ অন্য ।"
অনির্বাণ বুঝতে পারলো, তাকে ব্যবহার করা হয়েছে । সে আর্যশেখরের কাছে গেল জবাবদিহি করতে ।
"হ্যাঁ, আমি জানতাম তুমি বিক্রমের সন্তান নও, আর তোমায় দেওয়া ডি.এন.এ পরীক্ষার ফলও জাল" আর্যশেখর ঠাণ্ডা স্বরে বলল, "কিন্তু তাতে কী ? আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে ।"
"আমি তোমার হাতের পুতুল নই, আমি সব ফাঁস করে দেবো" অনির্বাণ রাগে ফেটে পড়ে বললো । আর্যশেখর ঠান্ডা মাথায় বললো, “দেরী করে ফেলেছো, তার আগেই আমি নিজেই সব ফাঁস করে দেবো । আর কেন করেছি তাও ফাঁস করবো ।“
মুখোমুখি সংঘাত
অনির্বাণের সঙ্গে কথোপকথনের পরদিনই, সিংহরায় ম্যানশনের ড্রইংরুমে, আর্যশেখর প্রকাশ করল তার আসল পরিচয় ।
"তুমি... বিশ্বনাথের ছেলে?" বিক্রমের হাত কাঁপতে লাগল ।
"হ্যাঁ । যে শিশুকে আপনি দশ বছর আগে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিলেন, সে আজ আপনার সাম্রাজ্যের ধ্বংসকর্তা ।"
বিক্রমের চোখে জল চলে এলো, “বিশ্বাস করো, আমি তোমার বাবাকে হত্যা করতে বলিনি, তোমাদের হত্যা করতে চাইনি ! ওই গুণ্ডারা নিজেরাই মাতাল অবস্থায় এইসব করেছিলো ! আমি তাদের বিচার করিয়েছিলাম !"
"মিথ্যা কথা !" আর্যশেখর চিৎকার করে উঠলো ।
"না, উনি সত্য কথা বলছেন," পিছন থেকে এক কণ্ঠ ভেসে এলো । প্রবেশ করলেন বৃদ্ধ গুরুচরণ, গ্রামের প্রাক্তন পঞ্চায়েত প্রধান, "আর্যশেখর, আমি তোমাকে খুঁজেছি বহু বছর । তুমি সেই রাতে পালিয়ে গিয়েছিলে । সেদিনের ঘটনার আমি প্রত্যক্ষদর্শী । বিক্রমবাবু তোমার ভাই অনিকেত, তার চিকিৎসার সব ব্যবস্থা বিক্রমবাবুই করেছিলেন । তোমার মায়ের শেষকৃত্য... তিনি গুণ্ডাদের শাস্তি দিয়েছিলেন, তোমার পরিবারের জন্য আর্থিক সাহায্য পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু স্থানীয় নেতারা সেই টাকা আত্মসাৎ করেছিলো ।"
আর্যশেখর পৃথিবী যেন এক লহমায় উলটে গেল । সে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো । তারপরে এক সময় আর্যশেখর গর্জন করে উঠলো, "এসব মিথ্যা কথা! আমি বিশ্বাস করি না।" বলে সে দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিলো ।
কিন্তু হৃদয়ের গভীরে সে বুঝতে পেরেছিলো, এটাই সত্য-তার প্রতিশোধের ভিত্তিই ছিল ভুল । সে শুধু একজন নির্দোষ মানুষকে ধ্বংস করেনি, নিজেকেও শেষ করে ফেলেছে । বিক্রম হারিয়েছেন সবকিছু, কিন্তু তার চেয়েও বেশি হারিয়েছে আর্যশেখর – তার ন্যায়বিচারের দাবি, তার মানবতা ।
পড়ুন - একটি মর্মস্পর্শী বাংলা গল্প - বাবার সাইকেল
প্রায়শ্চিত্ত
গোবিন্দপুর গ্রামের ভগ্ন মন্দির । আর্যশেখর সেই ভগ্নমন্দিরের মূর্তির পাথরের বেদীর সামনে দাঁড়িয়ে । দশ বছর আগে সে যে শপথ নিয়েছিল, আজ সেখানেই সে ফিরে এসেছে।
"আমি ভুল করেছি," সে চেঁচিয়ে বলছিলো, "প্রতিশোধ আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিলো । আমি ন্যায় চেয়েছিলাম, কিন্তু তৈরি করেছি নতুন অবিচার ।"
পিছনে বিক্রম সিংহরায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন । "আর্য," তার কণ্ঠে করুণা, "তুমি আমার সাম্রাজ্য ধ্বংস করেছো, কিন্তু আমি তোমায় ক্ষমা করেছি । কারণ আমিও একদিন প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম, আর তার ফলভোগ করেছি সারাজীবন ।"
"আপনার ক্ষমা আজ আর আমার চাই না," আর্যশেখর বলল, "আমি আর ঘরে ফিরব না, সংসারে থাকবো না । আমি যাত্রা করব তীর্থে, প্রতিটি পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য।"
"প্রায়শ্চিত্ত শাস্তির মধ্যে দিয়ে হয় না, সংশোধন করতে হয়," বিক্রম বললেন, "আমার সাথে ফিরে চলো, আমরা আবার নতুন করে শুরু করি ।"
কিন্তু আর্যশেখর ফিরে তাকাল না । সে পা বাড়াল অজানার পথে । পিছনে পড়ে রইল গোবিন্দপুর গ্রাম, গঙ্গার কলকল ধ্বনি, আর এক ভুলের বোঝা, যে বোঝা বইতে হবে বাকি জীবন ।
অগ্নিশিখার শেষ চিহ্ন
প্রতিশোধের অগ্নিশিখা যখন নেভে, তখন ছাইয়ের মধ্যে যা থাকে তা হলো শূন্যতা । আর্যশেখর বুঝেছিল, ন্যায়বিচার আর প্রতিশোধ কখনো এক নয় । ন্যায়বিচার সৃষ্টি করে, প্রতিশোধ ধ্বংস করে ।
গল্পের শেষে বিক্রম সিংহরায় তার সম্পদ পুনরুদ্ধার শুরু করেন, কিন্তু আর্যশেখর হারিয়ে গেলো চিরতরে । শোনা যায়, কেউ কেউ হিমালয়ের কোনো মন্দিরে এক তপস্বীকে দেখেছে, যে দিনরাত অগ্নিতে আহুতি দেয়, আর বলতে থাকে : "অহংকারের অগ্নিতে পুড়েছি, ক্ষমার জলে নিভেছি।"
নৈতিকতা : "প্রতিশোধের পথ কাঁটায় ভরা, যে পথে যাত্রা করলে ফেরার পথ হারিয়ে যায় । ন্যায়ের পথ কঠিন, কিন্তু সেই পথেই পাওয়া যায় মুক্তি ।"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন