ঘরের মধ্যে একটি ফিসফিস আওয়াজ... একটি অসম্পূর্ণ উপন্যাস... আর এক আত্মহত্যা । 'অনন্যা' নামক স্বপ্নের বাড়িটি ডুবে গেল গভীর অন্ধকারে । রইলো দীপক সেনের অমীমাংসিত মৃত্যুর রহস্য .....
বাংলা রহস্য গল্প : আঁধারের আঁখি
বাংলা রহস্য গল্প - এক বৈশাখের পড়ন্ত বিকাল । সূর্য দিগন্তরেখায় গিয়ে মিশেছে আর সূর্যের রক্তিম আভায় গোটা আকাশের বুক যেন লাল রক্তের দাগের মতো লাল হয়ে রয়েছে । বর্ধমান শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে এক মফস্বল শহর । জেলের হাত থেকে ছুঁড়ে দেওয়া জাল যেমন ধীরে ধীরে জলে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনই অন্ধকার আস্তে আস্তে সেই শহরের উপর ছড়িয়ে পড়ছে । রাস্তাঘাট ক্রমশ: নিস্তব্ধ হয়ে আসছে, মানুষজন তাড়াহুড়ো করে কাজ সেরে বাড়ি ফিরছে । পাখিরা গাছগাছালিতে বাড়ি ফিরে চিৎকার চেঁচামেচির পরে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে ।
‘অনন্যা’ : স্বপ্নের বাড়ি নাকি অভিশপ্ত স্থান?
শহরের প্রান্তে একটি সুন্দর, ছিমছাম বাড়ি । বাড়িটি বড়ো সুন্দর । দেখলেই বাড়ির কর্তার রুচি যে সাধারণের থেকে একটু অন্যরকম, তা বোঝা যায় । বাড়ির নাম “অনন্যা” । কিন্তু বাড়িটি বড়ো শান্ত, নীরব । যেন খাঁ খাঁ করছে । গোটা বাড়িতে কোথাও কোন আওয়াজ নেই । দোতলা বাড়ির দরজার সামনে শুধু একটি আলো জ্বলছে । সেই সন্ধ্যায় বাড়িটি দেখলেই কেমন যেন গা ছমছম করে ওঠে ।
আসলে এই বাড়ির কর্তা দীপক সেন মাসছয়েক আগে মারা গেছেন । তার কিছুদিন পর থেকে গোটা বাড়িটায় আর কেউ থাকে না । শুধু একজন লোক সন্ধ্যার আগে এসে বাড়ির বাইরের আলোটি জ্বেলে চলে যায় ।
দীপক সেন : যিনি রহস্যের পিছনে ছোটেন, রহস্যেই ডুবে যান
এই বাড়ির কর্তা দীপক সেন ছিলেন একজন লেখক । রহস্য-রোমাঞ্চ, ভূত-প্রেত নিয়ে তার লেখাগুলি পাঠকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিলো । পূজার সময়ে বেশ কয়েকটি শারদীয়া পত্রিকায় তার লেখা বেরোতো । পাবলিশাররা তার বাড়িতে পূজার আগে থেকে তার বাড়িতে আসা-যাওয়া করতো তাদের পত্রিকায় তার লেখা পাওয়ার জন্যে । সেই অর্থে তাদের অবস্থাও ছিলো বেশ স্বচ্ছল ।
তাদের একমাত্র মেয়ে সুপর্না কোলকাতার ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ থেকে আই.টি নিয়ে বি.টেক পাশ করার পরে কলেজ ক্যাম্পাসিং থেকে চাকরী পেয়ে গিয়েছে একটি বড়ো কোম্পানীতে । কোম্পানী থেকেই তাকে কোলকাতায় থাকার জন্যে ফ্ল্যাটও দিয়েছে । সে সেখানে একাই থাকে । বাবা মারা যাওয়ার পরে সুপর্ণা বহুবার তার মাকে বলেছে কোলকাতায় এসে তার কাছে থাকার জন্যে । কিন্তু সুজাতা রাজি হননি ।
আসলে “অনন্যা” সুজাতা আর দীপকের দু’জনেরই স্বপ্নের বাড়ি । অনেক কষ্ট, অনেক সংগ্রাম, অনেক ঘাম-রক্ত ঝরানো আর স্বপ্ন দিয়ে তৈরী সেই বাড়ির নকশা । সুজাতা আগে সেখানকার একটি স্কুলে চাকরী করতেন । আগে তারা দক্ষিণ-চব্বিশ পরগণার রানাঘাটে থাকতেন । সেটি ছিলো দীপকদের আদি বাড়ি । দীপকের মা মারা যাওয়ার পরে সম্পত্তি নিয়ে দীপকের ভাই আর তাদের পরিবারের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঝামেলা লেগ্ই থাকতো । দীপক ঝামেলা পছন্দ করতেন না । আর ঝগড়াঝাটি-ঝামেলা-অশান্তিতে তার লেখালেখিরও খুবই অসুবিধা হতো ।
তাই যখনই সুজাতার চাকরীর সুবাদে এখানে আসার সুযোগ হলো, দীপক খুব খুশি হয়েই রাজি হয়ে গিয়েছিলো । বলতে গেলে একপ্রকার তারা জোরাজুরিতেই সুজাতা এখানে চাকরী করতে এসেছিলো ।
সেখানে যাওয়ার পরে তারা ভাড়াবাড়িতে থাকতেন, সেখানেই সুপর্ণার জন্ম আর বেড়ে ওঠা । তার বেশ কয়েক বছর পরে দীপকের আদি বাড়ি যখন ভাগাভাগি হয়, তখন সে কিছু টাকা নিয়ে তার ভাগের অংশ তার ভাইদের দিয়ে দেন । সেই টাকা দিয়ে জমিটি কেনা হয় । তারপরে ধীরে ধীরে অর্থ সঞ্চয় করে তৈরী হয় এই “অনন্যা” । সুপর্ণা তখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে । তারপর থেকে তারা সুখেই ছিলেন ।
সুপর্ণা চাকরী পেয়ে যাওয়ার পরে সুজাতা চাকরী থেকে স্বেচ্ছা-অবসর নিয়ে নেন । আর তারা দু’জনে বেশ ভালোই ছিলেন । দীপকবাবু বা সুজাতার কারোরই সেই অর্থে কোন বড় শারীরিক সমস্যাও ছিলো না ।
ঘাটশিলার রাজবাড়ি : রহস্যের সূচনা যেখানে
কিন্তু সমস্যা শুরু হলো অন্য এক কারণে । স্পষ্ট করে বলতে গেলে দীপক সেন একটি পুরাতন রাজবাড়ি নিয়ে একটি রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাস লেখার শুরু করার পর থেকে । ঘাটশিলার থেকে একটু দূরে এক রাজবাড়িতে কিছু রহস্যময় ব্যাপার আছে জানতে পেরে দীপকবাবু চলে যান সেখানে বিভিন্ন খোঁজখবর নিতে । এর আগেও তিনি এরকম করেছেন কয়েকটি উপন্যাস লেখার আগে । সুতরাং এর মধ্যে সুজাতা কোন অস্বাভাবিকত্ব দেখতে পায়নি । কিন্তু সেখান থেকে আসার পর থেকেই দীপকের মধ্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করতে থাকেন সুজাতা । বিশেষত: সেখান থেকে ঘুরে আসার পর থেকেই সন্ধ্যার পরে দীপক নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকতেন । এমনকি বেশ কয়েকদিন রাতের খাবারও খেতেন না । কেউ মানে সুজাতাও তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও বিরক্ত বোধ করতেন । তাদের মেয়ের ফোন এলেও তিনি কথা বলতে চাইতেন না বা তার ফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করতেন না ।
বন্ধ ঘরে ফিসফিস আওয়াজ : কী শুনতেন দীপক?
সুজাতা ভাবতেন, উপন্যাস লেখা নিয়ে চাপে আছেন তাই তিনিও তাকে বেশি বিরক্ত করতেন না । আসলে পুজোবার্ষিকী বেরোনোর আগে বেশ কয়েকবার এরকম চাপে থাকতে তিনি দীপককে দেখেছেন । কিন্তু একদিন সন্ধ্যার সময় তিনি দরজার চাবির ফুটো দিয়ে তিনি দেখলেন, ঘর অন্ধকার – আলো জ্বলছে না । তাহলে, দীপক অন্ধকার ঘরে কি করছেন, তিনি তো তাহলে উপন্যাস লিখছেন না । সুজাতার মনে প্রশ্নটা এলেও তিনি ভাবলেন হয়তো সেদিন মাথা ধরেছিলো, তাই তিনি লেখা বন্ধ করে বিশ্রাম করছিলেন ।
কিন্তু তার দিন দু’য়েক পরে তার মনে হলো দীপকের ঘরে কেউ কথা বলছে । তাই তিনি সেদিন দরজায় কান পাতলেন আর শুনতে পেলেন, ফিসফিস স্বরে কেউ যেন দীপককে কিছু বলছে । তিনি চাবির ফুটো দিয়ে দেখলেন ঘরের ভেতরটা অন্ধকার, অর্থাৎ দীপক আলো জ্বালেনি, আর ফিসফিস স্বরে কেউ যেন দীপককে কিছু বলছে । সেই স্বরে অন্যরকম কিছু একটা অন্যরকম অনুভূতি আছে ।
স্বরটা শুনে যেন সুজাতার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো । ঐটুকু ফুটো দিয়েই ঘরের মধ্যে সে দীপককে খুঁজে দেখার চেষ্টা করলো । আর দেখতে পেল, দীপক একটা দেওয়ালের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে আছে । আর যেন মন দিয়ে সেই স্বরের কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করছে । হঠাৎ যেন সুজাতার অস্তিত্ব বুঝতে পেরে সেই কন্ঠস্বর থেমে গেলো ।
গোটা ঘর নিস্তব্ধ, কিন্তু দীপক অনেকক্ষণ সেই একই রকম ভাবে বসে আছেন । সুজাতা দীপককে ডাকাডাকি শুরু করলেন । কিছুক্ষণ বাদে দীপক সাড়া দিলেন আর ডাকার কারণ জানতে চাইলেন । সুজাতা জানালেন যে ঘর থেকে বেরিয়ে রাতের খাবার খেয়ে নেওয়ার জন্যে । কিন্তু দীপক বেশ বিরক্তি মেশানো গলায় বললেন তাকে খেয়ে নিতে, তিনি রাতে কিছু খাবেন না । সুজাতা বুঝতে পারলেন, দীপক ঠিক আছে । তাই তাকে আর বেশি বিরক্ত করলেন না ।
কিন্তু সেইদিন থেকে সুজাতার মনটা খচখচ করতে লাগলো । একদিন তিনি দীপককে এই ব্যাপারে কথা বলতে চাইলেও দীপক ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলো । কিন্তু এই ঘটনার দিন কুড়ি পরে হঠাৎ একদিন রাতে দীপক গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করলেন । সেদিন রাতেও তিনি ঘরের মধ্যে ছিলেন, আর রাতের খাবারও খাননি । পরদিন সকালে অনেক বেলা হয়ে গেলেও দীপকের ঘরের দরজা না খোলায় সুজাতার মনে সন্দেহ হয় । কারণ রোজ সকালে উঠে দীপক মর্নিং ওয়াকে যান । আর মর্নিং ওয়াক থেকে দীপক ফিরে এলে সুজাতার সঙ্গে বসে চা খান, কথা বলেন । তারপরে বাজারে যান টুকিটাকি সবজি বা মাছ কিনতে ।
কিন্তু সেদিনকে সুজাতা অনেক ডাকাডাকির পরেও ঘরের ভিতর থেকে কোন সাড়া না পেয়ে তিনি কাজের লোককে দিয়ে কয়েকজন লোক ডাকিয়ে দরজা ভাঙতে দেখা যায়, দীপকবাবু বিছানার উপরে ফ্যানের সঙ্গে দড়ি লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন । তার টেবিলে ছিলো তার অর্ধেক লেখা উপন্যাসখানি । কেউ জানতে পারেনি, দীপক কেন আত্মহত্যা করলো ? কে আসতো দীপকের ঘরে রাতের বেলায়, যখন সুজাতা কাউকে কোনদিন আসতে দেখেনি । দীপককে রাতে অন্ধকার ঘরে সে দীপককে কি বলতো আর দীপকই বা তা শুনতো কেন ?
সুজাতা ও সুপর্ণা : হারানোর বেদনা ও অনিশ্চিত ভয়
এই ঘটনার পরে সুপর্ণা আর তার মাকে এই বাড়িতে থাকতে দেয়নি । একজন লোককে সে ঠিক করেছে, যে শুধু সন্ধ্যাবেলায় এসে বাড়ির বাইরের আলোটা জ্বেলে চলে যায়, আর সকালে এসে আলো নিভিয়ে ঘরটা একটু সাফসুতরো করে আবার চলে যায় । গোটা বাড়িতে শুধু পড়ে থাকে দীপকের স্মৃতি আর রহস্য । আর দীপকের লেখার টেবিলে পড়ে থাকে তার অসম্পূর্ণ উপন্যাস – “আঁধারের আঁখি” ।
(এই গল্পের স্থান, কাল, পাত্র সমস্তই কাল্পনিক, বাস্তবে এর সঙ্গে কোন মিল নেই । যে সমস্ত ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তা এসেছে কল্পনার হাত ধরে, গল্পের মাধ্যমে আনন্দ দানের জন্য । শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য এই গল্প রচিত হয়েছে । গল্পটি পড়ে ভালো লাগলে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, চেনা-পরিচিতদের সঙ্গে অন্যদের শেয়ার করবেন।)
পড়ুন আরো রহস্য গল্প : WB - 14 7566
ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের গল্প পড়ুন - "গল্পের ঝুলি"তে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন