মানবিকতার গল্প : উত্তর চব্বিশ পরগণার শ্যামনগর স্টেশনের কাছে একটি বস্তি । কোনরকমে বাঁশ আর দরমা দিয়ে তৈরী একটা ঘর । তার চালে কোন একসময় কিছু টালি ছিলো, এখন বেশিরভাগটাই পলিথিন দিয়ে মোড়া । বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে । সেই টালির ঘরে একটা বেঞ্চির থেকে একটু বেশি চওড়া কাঠের তক্তপোষে ছোট্ট সাত বছরের সৌরভ বসে আছে, বাইরের বৃষ্টির ঠান্ডায় সে একটু একটু কাঁপছে । তক্তপোষের নীচে পাতলা একটা মাদুরে বসে আছে তার জাহাঙ্গীর মামা ।
যার তিন কূলে কেউ নেই, তার .....
জাহাঙ্গীর, মানে জাহাঙ্গীর সর্দার । শ্যামনগর স্টেশনের বাইরে রিক্সা-স্ট্যান্ডে রিক্সা চালায় । জাহাঙ্গীরের তিন কূলে কেউ নেই । তাদের বাড়ি ছিলো বনগাঁয় । সে ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছে যক্ষায় । মা বাড়ি বাড়ি কাজ করে কিছুদিন সংসার চালিয়েছিলো । জাহাঙ্গীরের যখন ১৬-১৭ বছর বয়স তখন মাও অসুস্থ হয়ে চলে গেলেন কবরে । ছোট্ট বাড়িটার দখল নেওয়ার জন্য জ্ঞাতিগুষ্ঠীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাড়ি বিক্রি করে অল্প কিছু টাকা নিয়ে জাহাঙ্গীর ১৮-১৯ বছর বয়সে এসে পৌঁছায় শ্যামনগরের এই বস্তিতে । তারপর রিক্সা কিনে স্টেশনে চালাতে থাকে নিজের পেট চালানোর জন্য । বিয়ে-থা আর সে করেনি । স্মৃতি,
লড়াই আর কৃতজ্ঞতা
ফিরে
আসা
উত্তরণের
শুরু
একদিন লাস্ট ট্রেনের প্যাসেঞ্জার ধরতে স্টেশনে এসে জাহাঙ্গীর দেখতে পায় একলা পড়ে থাকা আড়াই-তিন বছরের ছোট্ট একটি শিশুকে । আশেপাশে কেউ কোথাও নেই । শুধু তার বাজুবন্ধে একটা রুপোর কবচে লেখা ছিলো সৌরভ । অনেকক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছিলো জাহাঙ্গীর । না, কেউ আসেনি । যখন আর কেউ এলো না, আর বাচ্চাটা ক্ষিদেয় কাঁদতে লাগলো, তখন জাহাঙ্গীর আর না থাকতে পেরে তাকে নিয়ে নিজের বাসায় নিয়ে গিয়েছিলো । পরের দিন থানায় গিয়ে জানিয়েওছিলো সে বাচ্চাটার কথা । থানার অফিসার জানিয়েছিলো যতোদিন ওর বাবা-মার খোঁজ না পাওয়া যায় ওকে অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য । তখন জাহাঙ্গীর মুচলেকা দিয়ে বাচ্চাটাকে নিজের কাছে নিয়ে এসে রাখে । তখন থেকে সৌরভ ওর কাছেই থাকে । ওর বাবা-মার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি বা থানা থেকেও আর কখনো কেউ আসেনি ওর খোঁজ করতে ।
ভালোবাসা আর ত্যাগ
"ছোটু..." জাহাঙ্গীর মামার গলা ভারী, কিন্তু কোমল। তিনি দুটো রুটি আর অল্প আলুভাজা বাড়িয়ে দিলেন । "নে, খেয়ে নে। খালি পেটে ঠান্ডা বেশি লাগে।"
সৌরভ রুটি দুটোর দিকে তাকালো, তারপর তাকালো জাহাঙ্গীর মামার হাতের দিকে। সেই হাত রিকশা টানার দাগে ভরা, শক্ত চামড়ার মতো । তার শুধু ক্ষিদেই লাগেনি, মনেও প্রচুর বিস্ময়। কেন? কেন এই মানুষটা, যার নিজেরই এত কষ্ট, সে তাকে নিজের খাবার বাড়িয়ে দেয় ? কেন ভোর হতেই ওঠে আর চায়ের দোকানে বাসন মেজে বাড়তি দু-পয়সা রোজগার করে, শুধু সৌরভের খাতা-পেন্সিল কিনে দেবার জন্য ? কেনই বা একটা ডিবেয় পয়সা জমায় তার স্কুলের জামা জুতো কিনে দেওয়ার জন্য ?
"মামা... তুমি খাও । তুমি তো সারাদিন রিকশা টেনেছো ।" জাহাঙ্গীরের চোখের কোণে ক্লান্তির রাশি, তবুও প্রশান্তির হাসি হেসে বললেন, “তোকে বই পড়তে দেখলেই আমার পেট ভরে যায়, ছোটু । তুই খা, খেয়ে নে । কাল স্কুল আছে ।"
স্কুল! সৌরভের জন্য জাহাঙ্গীর মামার স্বপ্ন । নিজে ঠিকঠাক পড়তে-লিখতে জানেন না। কিন্তু লেখাপড়ার জোর বোঝেন । দুনিয়ার সাথে লড়াই করেন অদম্য জেদ নিয়ে, যাতে সৌরভকে রিকশা টানতে না হয়, বাসন মাজতে না হয় । সে যেন পড়াশোনা করতে পারে, জীবনে যেন কিছু করতে পারে ।
সময় যেতে থাকে । জাহাঙ্গীর আর সৌরভের দিন যেতে থাকে বস্তির পিছনের নালার জলের মতো । পঙ্কিল, ধীর গতিতে, মনে হয় স্থির, কিন্তু খুঁজে দেখলে দেখা যাবে কোথাও যেন তিরতির করে জল বইছে । ক্ষিদের জ্বালা, প্রতিদিনের অতিরিক্ত পরিশ্রমের মধ্যেও সৌরভ খুঁজে পায় ‘মামা’র স্নেহ । সৌরভ পড়তে থাকে রিকশার সিটে বসে ফুটপাথের আলোয়, ঘরের প্রায় নিবু নিবু বালবের আলোয় ।
স্বপ্নের আলো
সৌরভ এখন বুঝতে শিখেছে । তাকে অনাথ আশ্রমে না যেতে দেওয়ার জন্য কাল্পনিক বাবা-মায়ের পরিচিতিতে ‘মামা’র ছাতার ছায়ায় সে বড় হচ্ছে । সে জানে এই দুনিয়ায় এই ‘মামা’ ছাড়া তার আর কেউ নেই, কিন্তু সেও আপন নয় । সে মাঝে মাঝেই বিস্মিত হয়, কিসের টানে, কিসের আবেগে এই মানুষটা একটা বিধর্মী শিশুকে বুকে করে আগলে রেখেছে ? কি সেই স্বপ্ন, যার জন্যে ‘মামা’ উদয়াস্ত পরিশ্রম করে চলে ?
কিছুটা বুঝতে পারে যখন সে স্কুলের পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে, আর ‘মামা’র মুখে দেখতে পায় গর্বের আলো, খুশির উজ্জ্বলতা । তাই সেও পরিশ্রম করে আরো বেশি পড়ার জন্যে, পরীক্ষায় আরো ভালো রেজাল্ট করার জন্য ।
তার ‘মামা’র দৃঢ়সংকল্প, জেদ আর পরিশ্রমের গুণ পায় সে । আর তার ফল হিসাবে সরকারী ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে স্কলারশিপ সহ পড়ার সুযোগ পেয়ে যায় সৌরভ । কলেজের হোস্টেলে যাওয়ার দিন যখন সৌরভ বেরোতে যাবে, তখন জাহাঙ্গীর তার হাতে তুলে দেয় দু’টো পাঁচশো টাকার নোট – কতো রাতের বিনিদ্র পরিশ্রম আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে জমানো টাকা ! আর বৃষ্টিভেজা আকাশের মতো গলায় বলে –“ভালো করে পড়িস ছোটু । আমার জন্যে একদম ভাববি না । নিজেকে অনেক বড় জায়গায় নিয়ে যা । অনেক ভালো কিছু করিস । আর যেন এখানে ফিরতে না হয় ।“
স্মৃতি,
লড়াই আর কৃতজ্ঞতা
সৌরভ কথাগুলো মনে রেখেছে । সে বুঝতে পেরেছে ‘মামা’র স্বপ্নের আকাশটাকে । জাহাঙ্গীর মামার প্রতিদিনের লড়াই, আত্মত্যাগের স্মৃতি মনে রেখে সে লড়াই করেছে । ‘মামা’র প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা তাকে দায়িত্বশীল করেছে, উদ্বুদ্ধ করেছে । সে স্কলারশিপ আদায় করেছে । প্রয়োজনে টিউশনি করেছে । কিন্তু তবুও সাফল্য রাতারাতি আসেনি ।
আজ বেশ কয়েক বছর বাদে অনেক লড়াই, অনেক পথ চলা, অনেক সংগ্রামের পর সে নামকরা ইঞ্জিনিয়ার, বড় কোম্পানীতে বড় পদে চাকরী করে । এই পথ চলার লড়াইয়ে অনেকে সাহায্য করেছে । তার কলেজের প্রফেসররা, তার কিছু সহপাঠী । কিন্তু তবুও সৌরভ ভোলেনি তার ‘মামা’র কথা ।
আর ভোলেনি বলেই একদিন বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় বড় গাড়ি, ভালো পোশাক পরে অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা চলে আসে শ্যামনগরের সেই বস্তিতে । যে বস্তির অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে সে প্রাণ পেয়েছে, পেয়েছে জীবন, পেয়েছে পরিচয়, পেয়েছে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার প্রেরণা ।
ফিরে
আসা
আলতো করে দরজা ঠেলে বস্তির ঘরে ঢোকে সৌরভ । কাঠের তক্তপোষে বৃদ্ধ, শীর্ণ, নুয়ে পড়া জাহাঙ্গীর তার দিকে পিছন ফিরে বসে আছে । অতিরিক্ত পরিশ্রম আর অপুষ্টির জন্য তার প্রচন্ড কাশির দমকের পরে সে হাঁফাচ্ছে । সৌরভ ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে হাঁটু মুড়ে বসে ডাকে “মামা” । সেই ডাকে এমন কিছু ছিলো যে বৃদ্ধ জাহাঙ্গীর বিদ্যুতের ঝলকের মতো মাথা তোলে, আর দেখতে পায় সৌরভকে । কিছুক্ষণ দেখার পরেই তার মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরোয় “ছোটু”! তার চোখ দিয়ে বেরোতে থাকে অবিরল অশ্রুধারা । সৌরভের সারা গায়ে পরম মমতায় হাত বোলাতে থাকেন তিনি । সৌরভ সব বাধা ভেঙে জড়িয়ে ধরে তার ‘মামা’কে । জাহাঙ্গীরের চোখে জলের ধারা তখন বাঁধ মানছে না ।
জাহাঙ্গীর ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেয় । বলে “এখানে আবার ফিরে এলি কেন ছোটু? তুই চলে যা, এখানে তোর জায়গা নয় ।“ বড় গাড়ি দেখে ততক্ষণে আশেপাশের বস্তির লোকজন জড়ো হয়েছে জাহাঙ্গীরের ঘরের সামনে ।
সৌরভ তার মামার শক্ত, কষ্টক্লান্ত হাত দু’টো নিজের হাতে তুলে নিয়ে শক্ত করে ধরে বললো জাহাঙ্গীরের চোখে তাকালো, আর কাঁপা কাঁপা গলায় বললো - "তুমি তোমার জীবন দিয়েছ আমার ছাতা হওয়ার জন্য, আমার শক্তির জায়গা হওয়ার জন্য... আমার সবকিছু হওয়ার জন্য । তুমি নিজে না খেয়ে আমায় খেতে দিয়েছো । অন্ধকারে আমার আলো হয়েছো । যার কিচ্ছু ছিলো না, কেউ ছিলো না, তাকে আশা দেখিয়েছো, পথ করে দিয়েছো ।“ জাহাঙ্গীরের চোখ দিয়ে তখন টপটপ করে জল পড়ছে । সৌরভ বলে চললো "তুমি তো শুধু আমার মামা নও । তুমি হলে সেই বাবা, যে আমায় বেছে নিয়েছিলো । যে মানুষটা আমায় বড় করেছে, মাথা উচু করে বাঁচার রাস্তা করে দিয়েছে । যে শুধু দিয়েছে, কিছু চায়নি। তুমিই তো আমার ‘বাবা’ ।"
তার বলা ‘বাবা’ শব্দটা যেন আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো । সৌরভের এত বছরের হাজার না বলা অনুভূতির ভার, জাহাঙ্গীরের হাজার কষ্ট-আত্মত্যাগ, হাজার নি:শব্দ ভালবাসার ভার যেন এই একটা শব্দে প্রকাশিত হলো, অনুরণিত হতে লাগলো ছোট্ট বস্তির ঘরে এই দু’টি অসম বয়সী মানুষকে ঘিরে অদৃশ্য এক বলয় তৈরী করে । যাদের মধ্যে রক্তের কোন সম্পর্ক ছিলো না । ছিলো মনুষ্যত্বের-মায়ার-মমতার-ভালোবাসার-আবেগের-কৃতজ্ঞতার সম্পর্ক ।
উত্তরণের
শুরু
সৌরভ বলে চললো, “ওঠো বাবা, আজ থেকে তোমার কষ্টের দিন শেষ । তোমার রিকশা টানার দিন শেষ । তুমি আজ থেকে আমার সঙ্গে থাকবে । তোমার কোন কথা আমি আজ শুনবো না । তুমি অনেকদিন আমায় দূরে ঠেলে রেখেছো, আর নয় । আজ থেকে তোমার বিশ্রাম । এখন থেকে আমিই তোমার দেখাশোনা করবো .... তোমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ।“ বলে সৌরভ উঠে দাঁড়ালো । ধীরে ধীরে তার জাহাঙ্গীর মামাকে সে সযত্নে তুলে ধরলো । জাহাঙ্গীর মামা ধীরে ধীরে কাঁপতে কাঁপতে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন । আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে তার দু’চোখ বেয়ে । তার শরীরের সমস্ত ব্যথা-কষ্ট যেন উধাও হয়ে গেছে । সারা মূখ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববিজয়ের প্রশান্তি আর না-জানা এক গর্বের ছবি ।
ধীরে ধীরে সৌরভ জাহাঙ্গীরকে নিয়ে এগিয়ে গেলো দামী গাড়িটার দিকে । জাহাঙ্গীর সর্দার, এগিয়ে চললো এক নতুন স্বর্ণালী জীবনের দিকে । পিছনে পড়ে রইলো তার সেই বস্তির ঘর, সেই বস্তির আশেপাশের লোকগুলোর বিস্ফারিত নয়ন । পঙ্কিল নালার জলের মতো তার পঙ্কিল অতীত । আজ যেন সে চলেছে তার অতীতের সব ভার মুক্ত হয়ে । শুধুমাত্র ভালোবাসা-পরিশ্রম-আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে সে আজ পেলো পিতৃত্বের পরিচয় ।
দামী গাড়িটার মধ্যে বসে সে তাকিয়ে রইলো তার ছেলের দিকে-তার ‘ছোটু’র দিকে । বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে । সামনে ড্রাইভিং সিটে বসে সৌরভ তার সামাজিক (জন্মদায়ী নয়) পিতাকে নিয়ে চলেছে এক সুন্দর জীবনের দিকে । যেমনটা তার ‘বাবা’ তাকে ছোট্টবেলায় রিক্সায় চড়িয়ে নিয়ে যেতেন রিক্সাস্ট্যান্ডে ।
"গল্পের ঝুলি" পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ । গল্পটি পড়ে ভালো লাগলে অন্যদের কাছে শেয়ার করবেন । আপনাদের করা শেয়ার, কমেন্টস আমায় উদ্বুদ্ধ করবে নতুন কিছু ভাবতে, নতুন কিছু লিখতে ।
পড়ুন মর্মস্পর্শী বাংলা গল্প : ‘বাবার সাইকেল’
পড়ুন মানবিকতার গল্প : "অতিথি"
(কাহিনীটি লেখা হয়েছে সম্পূর্ণ কল্পনার ভিত্তিতে । এখানে বর্ণিত স্থাম, কাল, পাত্র সমস্তই কাল্পনিক । গল্পটি পড়ে যদি ভালো লাগে তাহলে সবাইকে শেয়ার করার অনুরোধ রইলো ।)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন