বাংলা রহস্য গল্প : আজ আমরা এমন একটা গল্প পড়বো, যে গল্পটা রহস্য রোমাঞ্চে ভরা, গল্পটা পড়ে কখনো মনে হতে পারে ভূতের গল্প, কখনো মনে হতে পারে রহস্য গল্প, কখনো মনে হবে বন্ধুত্বের গল্প বা মানবিক সম্পর্কের গল্প বা কখনো মনে হবে গোয়েন্দা গল্প । WB-14 7566 গাড়ির নম্বর নিয়ে এই রহস্য রোমাঞ্চকর গল্পটি বাংলা গল্পপ্রেমীদের জন্য দারুণ লাগবে । এই গল্পে আপনি পাবেন ভূতের গল্পের রোমাঞ্চ, গোয়েন্দা কাহিনীর থ্রিল এবং মানবিক সম্পর্কের গভীরতা । গল্পের প্রধান চরিত্র অমিতের জীবনে আসে রহস্যময় কালো গাড়ি WB-14 7566, যা তাকে নিয়ে যায় এক অবিস্মরণীয় অ্যাডভেঞ্চারে ।

WB - 14 7566 

WB-14 7566

দুর্ঘটনার শুরু

অমিত অফিস থেকে ফিরছে, মফস্বল শহর হিসাবে বেশ রাত হয়েছে । ঘড়িতে প্রায় ১০.৩০ টা বাজে । আসলে শিয়ালদহ থেকে ৮.৩২-র ট্রেনটা না পেলেই এইরকম রাত হয়ে যায় । স্টেশন থেকে রোজকার মতো সে হেঁটেই ফিরছে । সন্ধেবেলায় এক পশলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় রাস্তা বেশ ফাঁকা । যদিও সে শ্রাবণীকে আগেই ফোন করে বলে দিয়েছে, যে তার ফিরতে রাত হবে । কারণ আজ একজন সহকর্মীর জন্মদিন ছিল । তাই অফিস থেকে সবাই মিলে রেস্টুরেন্টে খেয়ে ফিরেছে, ফোন না করলে শ্রাবণী তার জন্যে রান্না-বান্না করে বসে থাকতো । সামনে চৌমাথাটা দেখা যাচ্ছে, স্ট্রিট ল্যাম্পটা জ্বলছে, ওইখান থেকে ডানদিকে আর ৫-৭ মিনিট হাঁটলেই তাদের বাড়ি । শ্রাবণী নিশ্চয়ই জেগে বসে আছে ।

অমিত চৌমাথায় এসে ডানদিকে ঘুরে কুড়ি-বাইশ পা হেঁটেছে, হঠাৎ একটা গাড়ির শুনে দেখলো তার পেছনে একটা কালো রঙের গাড়ি প্রচন্ড গতিতে পাগলের মতো ছুটে আসছে তার দিকে, সে কি করবে বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ কে যেন একটা প্রচন্ড ধাক্কা দিয়ে তাকে রাস্তার ধারে ফেলে দিলো, আর গাড়িটা প্রচন্ড গতিতে সে যেখানটায় ছিলো সেইখানটা দিয়ে চলে গেলো । হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় অমিত থরথর করে কাঁপতে লাগলো, সে বুঝতে পারছিলো যেই ধাক্কা দিয়ে থাকুক, ধাক্কাটা সে না দিলে আজ তার কি হতো ।

কালো গাড়িটা যে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তাকে মারতেই এসেছিলো সেটা তার বুঝতে অসুবিধা হলো না । কিন্তু যে ধাক্কা দিলো, সে কই ? কাউকে সে দেখতে পেলো না । কিছু সময় পরে সে একটু ধাতস্থ হয়ে আবার বাড়ির দিকে হাঁটা দিলো । বাড়ি ফিরে সে শ্রাবণীকে কিছু বললো না - অযথা চিন্তা করবে । সে জামাকাপড় ছাড়তে গিয়ে দেখলো, তার হাতের ঘড়িটা ১০.৩৫ য়ে স্থির হয়ে আছে । অমিত ভাবলো, পড়ে যাওয়ার জন্যে হয়তো ঘড়িটা কোন কারণে বন্ধ হয়ে গেছে, সে আবার ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে ঠিক করে রাখলো, আর মুখ, হাত-পা ধুয়ে শুয়ে পড়লো ।

সেই রাতটার প্রথমদিকে একটু অস্বস্তিতে কাটলেও তারপরে অমিত ঘুমিয়ে পড়লো । আর অদ্ভুত ঘটনাটা দেখলো সকালে অফিস যাওয়ার সময়, ঘড়িটা দিব্যি ঠিক সময় দিচ্ছে । বেশ কিছুদিন কেটে গেলো, অমিত কাজ-কর্মের চাপে ঘটনাটা ভুলেও গেছে । কিন্তু আজ রাতে বাড়ি ফেরার সময়ে তার ঘটনাটার কথা আবার মনে পড়ে গেলো । কারণ, আজ এক অফিসের বন্ধুর বোনের বিয়ে ছিলো । ফিরতে বেশ রাত হয়েছে । রাত তখন ১১.২০ বাজে । সে চৌমাথার কাছে এসে পৌঁছেছে । সে মনে মনে ভাবছে, সেদিনের ঘটনাটা নেহাতই একটা দুর্ঘটনা ছিলো । রোজ রোজ কি আর সেইরকম ঘটবে নাকি ?

কিন্তু কেন ?

চৌমাথার কাছে এসে অমিত দুইপাশে ভালো করে দেখে নিলো, কোন গাড়ি আসছে কিনা । সোজা রাস্তা, গাড়ি এলে দেখা যাবে । কিন্তু কোন গাড়ি নেই । তাই অমিত চৌমাথা থেকে বাঁক নিলো তার বাড়ির দিকে । তিন-চার পা হাঁটার পরেই পিছন থেকে জোরে ধাক্কা ! রাস্তার পাশে পড়ে গিয়ে দেখতে পেলো, সেই কালো গাড়িটা দুরন্ত গতিতে ছুটে চলে গেলো ! অমিত হতবাক হয়ে রাস্তার পাশে বসে দেখতে লাগলো, প্রচন্ড গতিতে কালো গাড়িটার চলে যাওয়া । আজ কিন্তু অমিতের আর অতটা ভয় লাগছে না । কারণ, সে বুঝতে পারছে যে, গাড়িটা তাকে চাপা দিয়ে মারতে চাইছে, কিন্তু কেউ তাকে বারংবার বাঁচাচ্ছে । কে সে ? কেনই বা বাঁচাচ্ছে ? তার সঙ্গে অমিতের কি সম্পর্ক ? গাড়িটাই বা কার ? একই গাড়ি তাতে কোন সন্দেহ নেই । কেনই বা সে অমিতকে মারতে চাইছে ? অমিত তো একজন সাধারণ মানুষ । তার প্রচুর টাকা-পয়সা, জমি-সম্পত্তি নেই । তার সঙ্গে রাজনীতি, প্রোমোটারি, জমি-জমা লেন-দেন বা এইরকম কিছুরও কোন সম্পর্ক নেই । তাহলে তাকে কেউ মারতে চাইছে কেন ?

সারা সপ্তাহ অফিস-বাড়ি, বাড়ি-অফিস করতে করতেই তার সময় চলে যায় । সপ্তাহ শেষে পরিবার, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া বা কোন বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে একটু আড্ডা, আর না হলে রবিবার বেলায় ঘুম থেকে ওঠা, বাজার করা, খবরের কাগজ দেখা, দুপুরে ঘুম আর সন্ধ্যাবেলায় বাড়ির বাকি মানুষগুলোর সঙ্গে টি.ভি দেখা আর টুকিটাকি কথাবার্তা এইভাবেই অমিতের ছুটির দিন কেটে যায় । আসলে অমিত আদ্যন্ত একটি পরিবারপ্রিয় ছেলে । তাহলে অমিতকে মারতে হবে কেন? তার তো কোন শত্রু নেই, থাকার আশা বা সুযোগও নেই ।

আস্তে আস্তে অমিত বাড়ির দিকে হাঁটা দিলো । কয়েকবার পিছন ফিরে সে দেখলো যে কেউ তার পেছু নিয়েছে কিনা । না, কেউ কোথাও নেই । সে ধীর পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে এলো । আজও সে শ্রাবণীকে কিছু বললো না । সে রাতের খাওয়া সেরে এসেছে বিয়ে বাড়িতে । সুতরাং খাওয়া-দাওয়ার ঝামেলা নেই । হঠাৎ তার খেয়াল পড়লো ঘড়িটার কথা । ঘড়িটা ঠিক ১০.৩৫ য়ে স্থির হয়ে আছে । হঠাৎ অমিতের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত যেন নেমে গেলো । সে একটুক্ষণ বিছানায় স্থির হয়ে বসলো, তারপরে আস্তে আস্তে ঘড়িটার সময় ঠিক করে নিলো । আর শ্রাবণীর কাছে এক গ্লাস জল চেয়ে খেলো । তারপরে মুখ, হাত-পা ধোওয়ার সময় ভালো করে সারা শরীরে ঘাড় থেকে পা অবধি জল দিয়ে ধুয়ে নিলো । সারা শরীরে ঠান্ডা জলটা পড়াতে সারাটা শরীর-মাথা যেন একটু ঠান্ডা হলো । বিছানায় শুয়ে শ্রাবণীর সঙ্গে বিয়েবাড়ির কয়েকটা কথা বলতে বলতে সে ঘুমিয়ে পড়লো ।

পুরানো বন্ধু - গোয়েন্দা

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঘড়িটার কথা তার মনে পড়লো । অদ্ভুত ব্যাপার, ঘড়ি ঠিক সময় দিচ্ছে । ঘড়ির কাজে কোথাও এতটুকু ফাঁকি বা গাফিলতি নেই । সে হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকলো । শ্রাবণী তাড়া দিলো স্নান করে রেডি হয়ে নেওয়ার জন্যে – না হলে অফিসের দেরী হয়ে যাবে । সারাদিন অফিসের ব্যস্ততায় তার কিছু মনে ছিলো না, কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় তার আবার সব মনে পড়ে গেলো । অমিত মনে মনে ভাবলো, কিছু একটা রহস্য তো আছে – ঘড়ি, ধাক্কা আর কালো গাড়ির মধ্যে । আর সেই রহস্যে নিশ্চয়ই সে কোন না কোন ভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত । তাকে খুঁজে বার করতেই হবে সেই রহস্যের কিনারা – না হলে সে শান্তি পাবে না । এমন সময় তার মনে পড়লো তার ছোটবেলার বন্ধু সার্থকের কথা । কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে উচ্চ পদে কাজ করে সার্থক । অমিত মনে মনে ঠিক করে নিলো যে করেই হোক, এই সপ্তাহে সে সার্থকের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখা করবেই ।

সার্থক আর অমিত মুখোমুখি বসেছে একটা কফি শপে । অমিত আস্তে আস্তে সার্থককে দুইবারের ঘটনাই যতটা পারলো, খুঁটিয়ে বললো । সব শুনে সার্থক একবার ঘড়িটা দেখতে চাইলো । সাধারণ টাইটানের ঘড়ি, বিয়েতে অমিত্ উপহার পেয়েছিলো । সার্থক ঘড়িটাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দিয়ে অমিতকে ফিরিয়ে দিলো । দুই-দিনের ঘটনারই তারিখ আর সময়টা সার্থক একটা নোটবুকে লিখে রাখলো । আর বলে রাখল, এর মধ্যে যদি আবার ঘটনাটা যদি ঘটে তাহলে অমিত যেন দুটো জিনিস লক্ষ্য করার চেষ্টা করে – গাড়ির নম্বর আর গাড়ির ড্রাইভারের মুখটা । কিন্তু সঙ্গে এটাও বলে দিলো কয়েকদিন যেন সে রাত করে না ফেরে । আর যেন খুব সাবধানে চলাফেরা করে ।

অমিত নিশ্চিন্ত হলো । সে ভেবেছিলো যে সার্থক হয়তো ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেবে না, হয়তো হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলবে – তাহলে বলতে চাইছিস, কেউ তোকে মারতে চাইছে আর একটা ভূত তোকে বারবার ধাক্কা দিয়ে বাঁচিয়ে দিচ্ছে ! অমিতের এটাও চিন্তা ছিলো যে যদি সার্থক ভাবে যে ফালতু গাঁজাখুরি গল্প শোনাবার জন্যে তাকে ডেকে সময়টা নষ্ট করালো ।

সার্থক দুইদিন পরেই অমিতকে ফোন করলো এবং তাকে সাবধানে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে বললো । সে নাকি অমিতের দেওয়া তারিখগুলোর রাস্তার সি.সি. টি্ভি রেকর্ডিং থেকে দেখতে পেয়েছে কালো গাড়িটাকে এবং সেই গাড়িটা একজন মানুষকে চাপা দিয়ে মারতে চাইছে । অমিতের দেওয়া পোশাকের বিবরণ থেকেই সে এটাও নিশিচত করতে পেরেছে যে সেই মানুষটি অমিতই । কিন্তু প্রচন্ড গতির কারণে আর রাতের অন্ধকারে আলো কম থাকার জন্যে সে এখনো গাড়ির নাম্বারটা নিশ্চিত করতে পারেনি । তাই সে তার অনুসন্ধানের কাজে এগোতে পারছে না । সার্থক এটাও খেয়াল রাখতে বললো যে, সেই একই গাড়ি অমিতকে অন্য কোথাও ফলো করছে কিনা । অমিত এটা জেনে নিশ্চিন্ত হলো, তাহলে যে ঘটনাগুলো তার সঙ্গে ঘটেছে সেগুলো তার মনের ভুল নয় এবং এটা জেনেও নিশ্চিন্ত হলো যে সার্থক ব্যাপারটাকে কোনভাবেই হালকা ভাবে নেয় নি ।

রোশনীর সঙ্গে দেখা

তিনদিন পরে হঠাৎ দূপুরবেলায়, সার্থক অমিতকে ফোন করে জানালো যে সে যেন আজ রাতে অফিস থেকে দেরী করে বাড়ি ফেরে । অমিত কিছু্‌ই বুঝতে পারলো না যে সার্থক এইরকম কেন করতে বলছে, কারণ দিন তিনেক আগেই তো সে তাকে  সাবধানে চলাফেরা করতে বললো । যাই হোক, সার্থক যখন বলছে তখন সে তাই করবে স্থির করলো ।

রাত ১১.১০, অমিত বাড়ি ফিরছে । রাস্তা সুনসান, ফাঁকা । সন্ধেবেলা কালবৈশাখীর ঝড় হয়েছে, আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা । আজ অমিত বেশ সতর্ক রয়েছে । আর বেশ জোরে জোরে হাঁটছে । রাস্তার চৌমাথাটা টপকে যেই সে তিন-চার পা এগিয়েছে, পিছনে গাড়ির আওয়াজ পেলো সে, আর সঙ্গে সঙ্গে সে জোরে ছুটতে লাগলো । কিছুটা ছুটেই সে উঁচু একটা জায়গায় উঠে ঘুরে দাঁড়ালো । আর সঙ্গে সঙ্গে সে এক পলক দেখতে পেলো রোশনীকে । কিন্তু সে ঘুরে দাঁড়ানো মাত্রই রোশনী যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো ।

আজ কিন্তু অমিত স্পষ্ট দেখতে পেলো কালো গাড়িটাকে । গাড়ির নাম্বার WB – 14 7566. গাড়িটা আজ একটু দূরে দাঁড়িয়ে গেছে, কারণ অমিত বেশ উঁচুতে দাঁড়িয়ে পড়েছে । কিন্তু এর পরেই দেখা গেলো, রাস্তার দুই প্রান্তে দুটো পুলিশ ভ্যান রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে রয়েছে । কালো গাড়িটা আটকে পড়েছে ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো, সামনে পিছনে পুলিশ ভ্যান, মাঝখানে কোন গলিতে গাড়ি যাওয়ার মতো কোন রাস্তা নেই । হঠাৎ সরু গলি, বাড়ির পিছন থেকে কিছু সাদা পোষাকের পুলিশ বন্দুক হাতে গাড়িটাকে ঘিরে ধরলো । তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছে রিভলবার হাতে সার্থক নিজে ।

কালো গাড়িটা তখনো গাড়িটা স্টার্ট বন্ধ করেনি । আস্তে আস্তে ভ্যানগুলো এগিয়ে এসে গাড়িটার কাছে এসে এমনভাবে দাঁড়ালো যে, গাড়িটার আগুপিছু করার জায়গাও রইলো না । এরপরে গাড়ি থেকে নেমে এলো একজন লম্বা, চওড়া, স্বাস্থ্যবান, সুন্দর দেখতে একজন যুবক ছেলে । গাড়ি থেকে নামতেই একজন পুলিশ তার হাতে পেছন থেকে হাতকড়া পরিয়ে দিলো । আর ঠেলে ঠেলে পুলিশের ভ্যানে তুলে দিতেই পুলিশের ভ্যানটা তাকে নিয়ে চলে গেলো । আর তার গাড়িটাকে অন্য একজন পুলিশ চালিয়ে নিয়ে চলে গেলো ।

বেশিরভাগ পুলিশ চলে যেতেই ধীর পায়ে সার্থক এগি্য়ে এলো অমিতের দিকে । অমিত তখনো হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে ।

তার চোখের সামনে কি কি ঘটে গেলো সে তখনো কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না । তার চোখের সামনে তখনো ভেসে উঠছে রোশনীকে দেখার দৃশ্যটা । সার্থক তার কাছে এসে তার গায়ে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো সে ঠিক আছে কিনা । অমিত যেন সম্বিত ফিরে পেলো । তারপরে বলে উঠলো, রোশনী ! সার্থক বললো কে রোশনী ? অমিত বললো রোশনীকে খুন করেছে । সার্থক বললো তুই কি সব বলছিস ? কে রোশনী ? কে খুন করেছে ? তুই এক কাজ কর, কাল অফিস যাস না, তোকে নিতে ১০টার সময় গাড়ি পাঠাব, কাল সব কথা হবে, রেডি থাকিস । তুই এখন বাড়ি যা, বিশ্রাম নে, কাল দেখা কর, সব কথা হবে । আমি কি তোকে একটু এগিয়ে দেবো ? অমিত বললো না, আমি ঠিক আছি, যেতে পারবো । অমিত আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো । বাড়ি ফিরে অমিত মুখ, হাত-পা ধুয়ে, রাতের খাবার খেয়ে হালকা একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো । আগামীকাল অফিস যাওয়ার তাড়া নেই, একটু বেশিক্ষণ ঘুমাতে চাইছে সে ।

পরেরদিন সকাল ৯-টা অবধি অমিত ঘুমালো । শ্রাবণী জানতো, অমিত আজ সার্থকের সঙ্গে দেখা করতে যাবে এবং অফিস যাবে না, তাই সে-ও অমিতকে ঘুম থেকে তোলেনি । বাড়ির সবাই বুঝতে পেরেছে কিছু একটা ঘটেছে, কিন্তু যেহেতু অমিত নিজে কিছু বলেনি, তাই কে্উ তাকেও বিরক্ত করেনি । অমিত ঘুম থেকে উঠে স্নান করে খা্ওয়া-দাওয়া করে তৈরী হয়ে নিলো । আজ অনেক ঝরঝরে লাগছে নিজেকে অমিতের, মনে হচ্ছে মাথা থেকে যেন কোন ভারী বোঝা নেমে গেছে । ঠিক সময়ে গাড়ি এসে গেলো আর গাড়িতে করে অমিত গেলো সার্থকের কাছে ।

রহস্যের মোড়

অমিত পৌঁছাতেই সার্থক এগিয়ে এসে তাকে নিয়ে গেলো নিজের কেবিনে । অমিত বসার পরে সার্থকও বসলো নিজের চেয়ারে । কোন রকম ভনিতা ছাড়াই অমিত বললো, রোশনীকে আমি চিনি না । কিন্তু আজ থেকে বছর তিনেক আগে আমাদের বাড়ির চৌমাথায় রাত ১০.৩৫-য়ে একটি মেয়েকে একটি কালো গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেলে । আমি তখন অফিস থেকে ফিরছিলাম, দূর থেকে আমি ঘটনাটা দেখতেও পাই, কিন্তু দুর্ঘটনার সাক্ষী হিসাবে পুলিশি ঝামেলার ভয়ে আমি আর কাউকে কিছু জানাইনি । পরেরদিন সকালে সবাই বলাবলি করছিল, যখন পুলিশ মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তার কাছ থেকে যে কাগজ পত্র পাওয়া গেছে, তাতে তার নাম লেখা ছিল রোশনী । 

কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে সেই রাতের দুর্ঘটনাটা নিছক দুর্ঘটনা ছিলো না । কারণ কাল রাতেও রোশনী ঠিক আমার পিছনে ছিলো, আমি পিছন ফিরতেই সে অদৃশ্য হয়ে যায় । এর আগের দুইবারও রোশনীই আমাকে পিছন থেকে ধাক্কা মেরে বাঁচিয়েছে, সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত । কালও সে আমাকে এসেছিলো বাঁচাতে, এই লোকটার হাত থেকে । কিন্তু এই লোকটা কেন আমাকে মারতে চাইছে ? তাহলে কি্ এই লোকটাই সেইদিন গাড়ি চাপা দিয়ে রোশনীকে মেরেছে ? সেই রাতের ঘটনাটা সত্যিই তাহলে দুর্ঘটনা ছিলো না – ছিলো খুন ? আর সেটাই কি বোঝানোর জন্যে আমাকে রোশনী আমায় বাঁচাচ্ছে ?

এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে অমিত দম নেওয়ার জন্যে একটু থামলো । আর সার্থক বলে উঠলো, অসাধারণ অমিত, তুই তো প্রায় সমস্ত জটই খুলে দিয়েছিস, বাকিটা আমি দেখে নিচ্ছি । আচ্ছা তোর রোশনীর দুর্ঘটনার তারিখটা কি মনে আছে, একদম নিশ্চিত না হলেও আগের বা পরের দিনের তারিখটা । অমিতের মনে ছিলো, তার জন্মদিনের ঠিক দুইদিন পরে, সুতরাং সে সার্থককে তারিখটা বলে দিলো । সার্থক বললো, তুই একটু বোস, আমি আসছি । বলে সে কোথাও একটা উঠে গেলো ।

মিনিট দশেক পরে একজন পিওন মতো লোক এসে অমিতকে বললো, “স্যার আপনাকে ডাকছে, আমার সঙ্গে আসুন” । বলে সে তাকে একটা বড় ঘরের সামনে নিয়ে গেলো । দরজা ভেজানো আছে । লোকটি বললো “স্যারেরা ঘরে আছেন, আপনি ভিতরে যান ।“ ঘরে ঢুকতেই সে দেখতে পেলো, সার্থক এবং আরো দু’জন অফিসার প্রজেক্টরে রোশনীর দুর্ঘটনার দিনকার সি.সি টি.ভি ফুটেজ দেখছে । সার্থক তাকে বলে উঠলো, থ্যাঙ্ক ইউ অমিত, তোর জন্যে আজ একটা খুনী ধরা পড়লো । এই গাড়িটা নিয়েই সুরজ রোশনীকে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করেছে । তোর দেওয়া তারিখের সি.সি টি.ভি ফুটেজে পরিষ্কার প্রমাণিত হয়েছে । অমিত বললো, সে ঠিক আছে, কিন্তু সুরজ রোশনীকে মারলো কেন ? আর কেনই বা রোশনী আমার কাছে এসে তাকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করলো । সার্থক একটু হেসে উঠে বললো, “আরে তুই তো পুরো পেশাদার গোয়েন্দাদের মতো কথা বলছিস । চল্ আগে হালকা কিছু খেয়ে নিই, তারপরে যাবো সুরজদের বাড়িতে, মনে হয় সেখানে সব উত্তর পাওয়া যাবে । ব্যাটা সুরজ ধরা পড়েছে, কিন্তু মুখ খুলছে না ।“

ভালোবাসার গল্প পড়ার জন্য ক্লিক করুন - "ভালোবাসার গল্প"

হালকা চা-কফি খেয়ে একটা কালো রঙের স্কর্পিও গাড়িতে সার্থক অমিতকে নিয়ে বেরোলো, সঙ্গে দু’জন অফিসার আর ড্রাইভার । গাড়িতে যেতে যেতে সার্থক অমিতকে বলতে লাগলো, এখন পর্যন্ত তারা যা তথ্য পেয়েছে – সুরজ বিশাল একজন বড় ব্যবসায়ী কানহাইয়ালাল পাটোয়ারীর বড় ছেলে । তার একটি ভাইও রয়েছে – সুনীল পাটৌয়ারী । বলতেই অমিত বলে উঠলো, আরে আমাদের সঙ্গে যে সুনীল কলেজে পড়তো – সেই সুনীল নাকি ! সার্থক বলে উঠলো, ঠিক ধরেছিস, আমিও তাই অনুমান করছি । কিন্তু কলেজে যেভাবে সুনীল থাকতো তাতে তো ওকে কখনোই এতো বড়লোকের ছেলে বলে মনে হতো না । খুবই সাধারণ ভাবে থাকতো, এখন একটা অ্যাড এজেন্সি চালায়, বিয়ে-থা করেনি, সম্পূর্ণ নিজের পরিশ্রমে সেই অ্যাড এজেন্সিটাকে সে দাঁড় করিয়েছে । তবে এখন তার অবস্থা খুবই ভালো, লেক টাউনের একটা ফ্ল্যাটে থাকে । যদি দেখা যায়, সে এই পরিবারের সঙ্গে কোনভাবে জড়িত, তাহলে তার কাছেও যেতে হবে ।

কথা বলতে বলতে সুরজদের বাড়িতে চলে আসা হলো, সুরজের মায়ের সঙ্গে অনেক কথা হলো । যা থেকে বোঝা গেলো, সুরজরা দুই ভাই, সুরজ আর সুনীল । সুরজ বারাবরই একটু উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির, আর সুনীল ঠিক তার বিপরীত । সুরজের বাবা অসুস্থ ছিলেন এবং প্যারালাইসিস হয়ে বিছানায় শয্যাগত ছিলেন, বছর তিনেক আগে মারা গেছেন । রোশনী সুরজের বাবার দেখাশোনার জন্যে নার্স হিসাবে সেই বাড়িতে চাকরী করতো । সার্থক তাদের ফ্যামিলি ডাক্তারের ফোন নাম্বার আর তার সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য এবং রোশনীর বাড়ির ঠিকানা, সুনীলের ঠিকানা-ছবি ইত্যাদি তথ্য নিয়ে নিলো ।

পুরানো বন্ধুকে ফিরে পাওয়া

সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া হলো সুনীলের অফিসে । সুনীল তো পুরানো বন্ধুদের দেখতে পেয়ে দারুণ খুশি । তার কেবিনেই বসে সব কথা হলো । যদিও অমিত আর সার্থক একটু আশ্চর্য হয়েছিলো যে, এই সুনীলই কি করে সুরজের ভাই হতে পারে – কেননা সুনীলকে তারা আগে থেকেই চিনতো । সুনীলকে কোন কিছুই লুকানো হলো না । সব বলার পরে সুনীল মাথায় হাত দিয়ে মুখ নামিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলো । তারপরে আস্তে আস্তে সব খুলে বললো – আসলে তাদের বাবা ব্যবসায়ী হিসাবে প্রচুর টাকা করেছেন, এমনকি হাজারিবাগের কাছে তাদের দুটো কয়লা খনিও আছে । কিন্তু টাকা-পয়সা, প্রাচুর্য এইসব কোন কিছুই ছোটবেলা থেকে সুনীলের খুব একটা ভালো লাগতো না । সে পছন্দ করতো স্বাভাবিক জীবন-যাপন এবং নিজের চেষ্টা কিছু করতে । ছোটবেলায় বেশির ভাগ সময়ই সে থাকতো দাদু-দিদিমার কাছে । মামার বাড়ি থেকে তার স্কুল কাছে হতো বলে পরিবারের বাকিরাও ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিলো । 

কিন্তু তার দাদা সুরজ ছিলো সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের । ছোটবেলা থেকেই মারামারি, ডানপিটে চরিত্রের জন্য সে বিখ্যাত ছিলো । বড় হয়ে তার সঙ্গে যুক্ত হলো বিভিন্ন ধরনের নেশা আর কুসঙ্গ । বিভিন্ন ধরনের জুয়া, নেশা ইত্যাদিতে সে আসক্ত ছিলো । প্রায়ই তার বাবা তাকে হুমকি দিতেন এইসব না ছাড়লে সুরজকে তিনি সমস্ত সম্পত্তি থেকে বেদখল করে দেবেন ।

সুনীল বলতে থাকলো, তার বাবা অসুস্থ হয়ে শয্যাগত হয়ে পড়ার পরে রোশনীকে রাখা হয়েছিল তার দেখাশোনা করার জন্যে । লেখাপড়া জানা, ভালো মেয়ে, বাবা ট্যাক্সি চালিয়ে তাকে নার্সিং পড়াচ্ছিলো । হঠাৎ বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ার পরে রোশনী পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয় । একটা ছোটখাটো প্রাইভেট নার্সিংহোমে নার্সের কাজ করতো আর তার বাবাকে দেখাশোনা করে সংসার চালিয়ে ভাই-বোনের পড়াশোনা চালাতো । যদিও সুনীল বাড়িতে খুব কমই যাতায়াত করতো, তবু বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ার পরে প্রায়ই যেতো ।

একদিন হঠাৎ তার বাবা্ ওনার ম্যানেজারের উপস্থিতিতে সুনীলকে তাদের পারিবারিক ব্যবসায়ের দায়িত্ব নিতে প্রস্তাব নেন । কিন্তু ততোদিনে সুনীলের নিজের ব্যবসা বেশ দাঁড়িয়ে যাওয়ায় সে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় এবং বলে, তার সেই ব্যবসায়ে কোন উৎসাহ নেই, তাছাড়া ম্যানেজার কাকা তো সব দেখছেন । সে বুঝতে পারে তার বাবা একটু মন:ক্ষুণ্ণ হয়েছেন । তার কিছুদিন পরেই বাড়ি থেকে খবর আসে বাবা মারা গেছেন । সে ভেবেছিলো যে সে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় বাবা দু:খ পেয়ে তাড়াতাড়ি মারা গেলেন । তাই তার নিজের উপর একটা মানসিক বোঝা চেপে বসেছিলো, যার জন্যে সে বাড়িতে যাওয়া আরো কমিয়ে দেয় । কারণ সে তার মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই তাকে মানসিক বোঝাটা কুরে কুরে খাচ্ছিলো । স্বাভাবিক ভাবেই বাবার মৃত্যুর পর তার বড় ভাই সুরজের কাছে ব্যবসা এবং সমস্ত সম্পত্তির অধিকার চলে আসে ।

সার্থক সুনীলকে থামিয়ে দিয়ে জানতে চায় তাদের ফ্যামিলি ডাক্তারের ব্যাপারে । সুনীল যে ডাক্তারের নাম বলে, সুনীলের মা কিন্তু সেই ডাক্তারের নাম, ঠিকানা দেয়নি । সব শোনার পরে সার্থক বলে উঠে বলে, শোন সুনীল তোর মা খুব অসুস্থ । আমার মনে হয় তোর এখন কয়েকদিন বাড়িতে যাতায়াত করা উচিত বা সেখানে গিয়ে থাকা উচিত । পরে আবার দেখা করবো, আজ একটু কাজ আছে । বলে বেশ তাড়াহুড়ো করেই সেখান থেকে বেরিয়ে এলো ।

বাংলা অ্যাডভেঞ্চার গল্প পড়ার জন্য ্ক্লিক করুন - "অ্যাডভেঞ্চার গল্প"

পাখি ধরার অভিযান 

গাড়িতে উঠে অমিত জানতে চাইলো, কি হলো – এইরকম করে বেরিয়ে এলি ? সার্থক বললো, সুরজ ধরা পড়েছে খবরটা জানতে পারলে পাখি পালিয়ে যেতে পারে, তাই । অমিত কিছু বুঝতে না পেরে জানতে চাইলো, “পাখিটা আবার কে ?” উত্তরে সার্থক হেসে বললো, “চল্ দেখতে পাবি ।“ বলে সে তার অফিসারদের কিছু নির্দেশ দিতেই সঙ্গে সঙ্গে তারা ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো । গাড়ি নিয়ে এসে তারা হাজির হলো তালতলার কাছে একটা ছোট্ট ক্লিনিকের সামনে ।

ক্লিনিক বলতে একটা চারতলা বাড়ি, সেই বাড়িতেই ডাক্তার থাকেন আর ক্লিনিক চালান । বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা গেলো, দুই-তিনটে পুলিশের জিপ, একটা লাল রঙের i-20 গাড়ি । বাড়ির মধ্যে ঢুকে দেখা গেলো, ডাক্তারকে মাঝখানে বসিয়ে আট-দশজন পুলিশ ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে ।

মনে হয়, সার্থকদের জন্যেই অপেক্ষা করা হচ্ছিলো । কারণ তারা পৌঁছাতেই একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে বলতে লাগলো, “ফোন আসার সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছি স্যার, আরেকটু দেরী হলেই পাখি পালিয়ে যেতো । গাড়ি রেডি হয়ে গিয়েছিলো, জিনিসপত্র, টাকা-পয়সা সব গাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে, শুধু গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার দেরী ছিলো ।“ ডাক্তার মাথা নীচু করে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে আছে । অমিত বুঝতে পারলো সার্থক "পাখি" বলতে কি বোঝাচ্ছিলো ।

রোশনী কে ?

ডাক্তারকে নিয়ে পুলিশ ভ্যান চলে গেলো তাদের হেড-কোয়ার্টার্সে । সার্থক এসে অমিতকে বললো, চল্ একবার রোশনীর বাড়ি থেকে ঘুরে আসি । সুরজের মায়ের দেওয়া ঠিকানায় এসে দেখা গেলো, সেখানে রোশনীর পরিবার আর থাকে না ।

আশপাশের প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, রোশনী মারা যা্ওয়ার কিছুদিন পরে তার বাবাও মারা যায় । তারপরে তাদের পরিবারকে দেখাশোনা করার মতো কেউ থাকে না । তারপরে রোশনীর মা তার দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যায় । বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পরে একজন মহিলা তাদের একটি ঠিকানা বলে দেয় । সেই ঠিকানা খুঁজতে অমিত আর সার্থকের কালঘাম ছুটে গেলো । বহুকষ্টে সেই ঠিকানা খুঁজে বার করে পৌঁছলে দেখা যায়, সেটি একটি বস্তির মধ্যে একচিলতে ঘর । সেই ঘরের মধ্যে আলো প্রায় ঢোকেই না, দিনের বেলাতেও বালব্ জ্বলছে । ঘরের মধ্যে আসবাব বলতে একটা তক্তপোষ আর একটা ছোট কাঠের আলমারী, আর দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার । দেওয়ালে দুটো ছবি – একটা রোশনীর আর অন্যটা তার বাবার । দুটো ছবিতেই অনেক দিন আগে দেওয়া দুটো মালা শুকনো অবস্থায় ঝুলছে ।  

ভুতের গল্প পড়ার জন্য ক্লিক করুন - "ভূতের গল্প"         

সেখানেই অমিতদের দুটো প্লাস্টিকের চেয়ারে বসতে দিলেন । রোশনীর প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি কেঁদে ফেললেন, অমিত আর সার্থক অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো । আস্তে আস্তে সামলে উঠে রোশনীর মা যা বললো – রোশনী মারা যাওয়ার পরে তাদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে পড়লেও চেয়ে-চিন্তে চলছিলো । কিন্তু তার বাবা মারা যাওয়ার পরে তাদের আর লোকজন ধারও দিতে চাইছিলো না । তাই রোশনীর মা পুরানো ঘর ছেড়ে এই ঘরে চলে এসেছেন, কোনরকমে লোকের বাড়িতে কাজ করে তিনজনের পেট চালাচ্ছেন । কিন্তু পয়সার অভাবে ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে । রোশনীই দায়িত্ব নিয়ে ছোট নার্সিংহোমে কাজ করে তার ভাই-বোনের পড়াশোনা চালাচ্ছিলো । তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ার সে বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে্ একজন বড়লোক বৃদ্ধের দেখাশোনার দায়িত্ব নেয় । কোন কোনদিন রাতে সে ফিরতো, কখনো কখনো রাতে ফিরতেও পারতো না ।

কিন্তু রোশনীর এই লড়াইতে কিছুটা হলেও তাদের আর্থিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হয়েছিলো । কিন্তু রোশনীর মৃত্যুতে সব শেষ হয়ে যায় । রোশনীর ছবিটা দেখে অমিতের মনটা হু-হু কর উঠেছিলো, তার চোখে প্রায় জল চলে এসেছিলো । হয়তো সার্থক সেটা বুঝতে পেরেই বলে উঠলো, রোশনীর ভাই-বোনের জন্য তারা যথাসাধ্য সাহায্য করার চেষ্টা করবেন । এই বলে সে উঠে পড়লো বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে ।

রাস্তায় আসার সময় সার্থক আর বেশী কথা বললো না । অমিতের কথার জবাবে শুধু হ্যাঁ, হুঁ করে গেলো । অমিত বুঝতে পারলো, রোশনীদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পরে সার্থকের মনটাও খারাপ হয়ে গেছে । তাই সে আর তাকে বেশি বিরক্ত করলো না । হঠাৎ সে খেয়াল করলো গাড়িটা তার বাড়ির কাছাকাছি এসে গেছে । অর্থাৎ সার্থক এর মধ্যেই কখন তার ড্রাইভারকে নির্দেশ দিয়ে দিয়েছে অমিতকে তার বাড়িতে ছেড়ে দেওয়ার জন্যে ।

অমিতের বাড়ির কাছাকাছি এসে তাকে নামিয়ে দিয়ে সার্থক বললো, কাল থেকে অফিস যা, আমি তোকে ফোন করে ডেকে নেবো দুই-একদিনের মধ্যে সব গুছিয়ে নিয়ে । আর চিন্তা করিস না, রোশনীর ভাই-বোনের জন্য একটা কিছু সঠিক ব্যবস্থা আমি করে দেবো, দেখে নিস । বলে সে গাড়ি নিয়ে চলে গেলো । অমিত কিছুক্ষণ গাড়িটা চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো । সত্যি, পুরানো বন্ধুরা এইরকমই হয় । সে ঠিক বুঝেছে যে অমিত মনে মনে ছটফট করছিলো এই বিষয়টা নিয়ে, কিন্তু কোন কূলকিনারা পাচ্ছিলো না ।

রহস্যের কিনারা

ঠিক দুই-দিন পরে সার্থক অমিতকে ফোন করলো বিকাল ৪টা নাগাদ । বললো, “অফিসে আছিস তো ?” উত্তরে অমিত জানালো “হ্যাঁ ।“ সার্থক বললো “অফিসে বলে আয়, আগামীকাল অফিসে আসতে পারবি না । যতটুকু ধোঁয়াশা আছে কাল সব পরিষ্কার হয়ে যাবে আর সব বাকি হিসাবও কাল মিলিয়ে দেবো । আগের দিনের মতো রেডি থাকিস, গাড়ি ঠিক সময়ে চলে যাবে, তৈরী থাকিস” – বলে সে ফোনটা কেটে দিলো । অমিত বুঝতে পারলো প্রচুর ব্যস্ততার মধ্যেই তাকে সার্থক কল করেছে । সত্যি, সার্থককে ধন্যবাদ জানানোর কোন ভাষা, বাক্য, শব্দ, অভিব্যক্তি কিছুই যেন তার কাছে নেই । নিজেকে তার ভাগ্যবান মনে হতে লাগলো এইরকম একজন বন্ধু পাওয়ার জন্যে । 

পরেরদিন যথাসময়ে অমিত গাড়িতে করে সার্থকের অফিসে এসে পৌঁছালো । সার্থকের কেবিনে ঢুকতেই সে বললো, “তুই এসে গেছিস । কফি খাবি ? একটু অপেক্ষা করতে হবে আমাদের, সুনীল আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢুকে যাবে । সুনীল এলে তারপরে সব বলছি । তুই ততক্ষণে কফি খা, আমি জাস্ট দু’মিনিটের মধ্যে আসছি” - বলে সে বেরিয়ে গেলো । একজন বেয়ারা কফি নিয়ে কেবিনে এসে অমিতকে কফি দিয়ে গেলো ।

কফিতে দু-চার চুমুক দেওয়ার পরেই দরজা ঠেলে সুনীল ঢুকলো । আমায় দেখে সে বললো, “ও তুই এসে গেছিস, সার্থক কোথায় ?” অমিত তাকে জানালো সার্থকের বেরিয়ে যাওয়ার কথা আর অপক্ষো করতে বলে যাওয়ার কথা । এই কথা শোনার পরে সুনীল একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলো । তাকে দেখে অমিতের দু’দিন আগের দেখা সুনীলকে মেলাতে কষ্ট হচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো এই দুদিন ধরে যেন অনেক ঝড় সুনীলের উপর দিয়ে বয়ে গেছে । অমিত সুনীলের কাছে জানতে চাইলো, “কি হয়েছে তার ?” জবাবে সে শুধু জানালো “সার্থককে আসতে দে । সব জানতে পারবি ।“

সার্থক এসে গেলো দু’চার মিনিটের মধ্যেই । এসেই সুনীলকে দেখে বললো, “আরে সুনীল এসে গেছিস । কি দেখলি বল ।“ সুনীল বলে উঠলো, “খুব বড় অপরাধ হয়ে গেছে ভাই আমার পরিবারের তরফ থেকে । তুই বলে দে আমি কি করে এর প্রায়শ্চিত্ত করবো ।“ সার্থক বললো, “আগে ঠান্ডা হয়ে বোস, সব ঠান্ডা মাথায় ঠিক করতে হবে ।“ বলে সে এক গ্লাস জল এগিয়ে দিলো সুনীলের দিকে । সুনীল এক চুমুকে জলটা শেষ করে দিলো । এরপরে সার্থক বলে উঠলো, “দ্যাখ, ডাক্তার স্বীকার করে নিয়েছে যে, সে টাকার লোভে সুরজের কথায় রাজি হয়ে গিয়ে স্লো-পয়জন দিয়েছে, যা দিয়ে  তোর বাবাকে খুন করা হয়েছে । সেই বিষক্রিয়ার কথা কোনরকমে রোশনী জানতে পেরে যায় এবং তোর দাদা তাকে হুমকি দেয় যে, রোশনী মুখ খুললে তাকে মেরে ফেলা হবে । কিন্তু পরে সে রোশনীর উপরে ভরসা না করতে পেরে তাকে এমনভাবে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চায় যেন সেটা একটা নিছক দুর্ঘটনা ছিলো । কিন্তু বাধ সাধে অমিত । সে এই ঘটনাটা দেখে ফেলে । কিন্তু সুরজ যখন দেখে যে অমিত কোনরকম প্রতিক্রিয়া করছে না, তখন সে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয় । কিন্তু তবুও সাবধানতা বশত: সে লোক লাগিয়ে রাখে অমিতকে নজরে রাখার জন্যে ।

এখন কথা হচ্ছে, সুরজ এইসব করলো কেন ? কারণ সে জুয়াখেলার জন্যে প্রচুর টাকা হেরে ধার করে বসে ছিলো এবং সে যাদের থেকে টাকা ধার করেছিলো তাদের মধ্যে দুই-একজন হলেন অন্ধকার জগতের কুখ্যাত ব্যক্তিত্ব  । তারা টাকা ফেরত পাওয়ার জন্যে সুরজকে চাপ এবং হুমকি দুই-ই দিতে থাকে । এইরকম সময়ে সুরজের বাবা তাকে ধমকি দেয় তাকে সম্পত্তি থেকে বেদখল করার । তখন সে প্রচুর টাকার বিনিময়ে ডাক্তারের সঙ্গে যোগসাজশ করে ফন্দি আঁটে তার বাবাকে সরিয়ে দেওয়ার ।

কারণ তার বাবার মৃত্যু হলে স্বাভাবিকভাবেই সম্পত্তির অধিকার তার কাছে চলে আসবে, আর সুনীল না থাকায় তার আরো সুবিধা হবে সম্পত্তির দখলের ক্ষেত্রে । আর সুনীলের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে সুরজ সহজেই বুঝিয়ে ফেলে তার মা-কে, যে পুরানো ডাক্তারের চিকিৎসায় তার বাবার কোন লাভ হচ্ছে না । তাই সে নতুন একজন ভালো ডাক্তার দিয়ে বাবার চিকিৎসা করাতে চায় । অতি সহজেই সে আগের ডাক্তারের জায়গায় নতুন ডাক্তারকে লাগিয়ে দেয় তার বাবার চিকিৎসায় । কিন্তু সেখানে বাদ সাধে রোশনী ।

রোশনী নার্সিং ট্রেনিং নিয়েছে এবং নার্সিংহোমের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে খুব সহজেই বুঝতে পেরে যায় যে সঠিক চিকিৎসা নয়, বরং চিকিৎসার নামে সুরজের বাবাকে ধীরে ধীরে খুন করা হচ্ছে । কিন্তু সুরজের হুমকি এবং টাকার প্রয়োজনে সে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় । কিন্তু বাবার মৃত্যুর পরে সুরজ আর কোন প্রমাণ রাখতে রাজি ছিল না বলে রোশনীকে খুন করে এবং অমিতের উপরে নজরদারি চালাতে থাকে । এর মধ্যে সে সম্পত্তির টাকা-পয়সা দিয়ে তার ধার মিটিয়ে দেয় এবং ডাক্তারকেও প্রচুর অর্থ পুরস্কার দেয় ।

এই অবধি সব সঠিক ছিলো এবং বছর কয়েক সময় এর মধ্যে গড়িয়েও যায় । কিন্তু হঠাৎ সে একদিন অমিতের ফেসবুক প্রোফাইলে লক্ষ্য করে সুনীল যে কলেজে পড়তো, সেই কলেজেই অমিতও পড়েছে আর দুইজনের পাশ করার বছরটাও একই । সে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে তাদের মধ্যে একসময় গভীর বন্ধুত্বও ছিলো । সুরজ ভয় পেয়ে অমিতকে খুন করার সিদ্ধান্ত নেয়, রোশনীর মতো করেই । কিন্তু এইবারে আর রোশনী চুপ করে থাকেনি, জীবিত অবস্থায় যে প্রতিবাদ সে করতে পারেনি, যে অন্যায় সে আটকাতে পারেনি, সেই কাজ সে করে দেখালো দু-দু’বার অমিতকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে । কারণ অমিতই ছিলো তার মৃত্যুর একমাত্র সাক্ষী । আর এইভাবেই সে অমিতকে বাধ্য করলো ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে । আর অমিত যোগাযোগ করলো আমাকে  আর তারপর থেকে সুরজ আর ডাক্তারের কীর্তির কথা একের পরে এক ফাঁস হয়ে যেতে লাগলো ।

মানবিকতার জয়

একটু থেমে সার্থক বললো “দ্যাখ্ সুনীল, আজ আমরা সবাই একসঙ্গে জড়ো হয়েছি । কিছু সত্যি আমাদের সবাইকে স্বীকার করে নিতে হবে । অমিত ঝামেলার ভয়ে রোশনীর দুর্ঘটনাটা চেপে গিয়েছিলো, তুই স্বার্থপরের মতো বাবা অসুস্থ জেনেও তার কাছে গি্যে খোঁজখবর নিসনি, তার মৃত্যুর পরে তোর মায়ের দায়িত্বও এড়িয়ে গিয়েছিস । আমরা সবাই অনুভূতিহীন যন্ত্রমানবের মতো হয়ে যাচ্ছি, আর ফল ভুগতে হচ্ছে রোশনীর মতো দায়িত্বশীল, লড়াকু মেয়েদের. যারা জীবনসংগ্রামে তাদের পরিবারকে বাঁচানোর, পরিবারের প্রয়োজনটুকু মেটানোর জন্য লড়াই লড়ছে

কিছু মনে করিস না সুনীল, তোর দাদা সরাসরি রোশনীকে খুন করেছে, তোর বাবার মৃত্যুর ষড়যন্ত্র করেছে, অমিতকে খুনের চেষ্টা করেছে । আর এই সমস্ত সে স্বীকার করে নিয়েছে ডাক্তার সব স্বীকার করে নেওয়ার পরে । সুতরাং কোনভাবেই সে রেহাই পাবে না । তবে আমি তোদের পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে তোকে কথা দিতে পারি এইসব ঘটনা বাইরের কেউ জানতে পারবে না, কিন্তু যদি তুই একটা দায়িত্ব নিস ।“ সুনীল বলে ওঠে “তুই কি বলবি আমি জানি, আর তুই না বললেও সেটা আমি করবো । আর কিভাবে করবো সেটাও ভেবে নিয়েছি । রোশনীর ভাই-বোন আর তার মায়ের সব দায়িত্ব আজ থেকে আমার । আমি কথা দিচ্ছি, রোশনী যেভাবে তার ভাই-বোনেদের মানুষ করতো, তার থেকে অনেক ভালোভাবে আমি তাদের মানুষ করবো । তার মাকে আমি এনে রাখবো আমাদের বাড়িতে ।“ সার্থক তার চেয়ার থেকে উঠে এসে আমাকে আর সুনীলকে জড়িয়ে ধরে বললো, সবাই বদলাক ভাই, আমরা বদলাবো না ।“

গাড়িতে করে বাড়ি ফেরার সময়ে সার্থকের কথাগুলো অমিতের কানে বাজছিলো । আজ চৌমাথাটা টপকে যখন গাড়িটা অমিতের বাড়ির দিকে ঘুরলো, তখন হঠাৎ সে ড্রাইভারকে বলে গাড়িটা থামিয়ে দিয়ে হাঁটা শুরু করলো । অমিতের মনে হতে লাগলো,  যেন রোশনীও তার সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটছে আর একেকটা দমকা বাতাসের মধ্যে দিয়ে বলে যাচ্ছে – থ্যাঙ্ক ইউ দাদাভাই । থ্যাঙ্ক ইউ আমায় বোঝার জন্যে । থ্যাঙ্ক ইউ আমার লড়াইকে সম্মান দেওয়ার জন্যে ।“ একা একা হাঁটতে হাঁটতে অমিতের চোখে জলের ধারা নেমে এলো । 

 

(এই গল্পের সমস্ত চরিত্র, তথ্য (গাড়ির নম্বর, নাম, স্থানের নাম) সমস্ত কাল্পনিক । পুরো কাহিনীর ঘটনাবলী প্রবাহিত হয়েছে কল্পনার স্রোতে - কাউকে আঘাত করা, আহত করার উদ্দেশ্যে নয় ।)    

গল্পটা পড়ে ভালো লাগলে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন বা চেনা-পরিচিতদের মধ্যে  শেয়ার করবেন আর কমেন্ট করে উৎসাহিত করবেন যাতে আরো ভালো ভালো গল্প লেখার জন্যে উজ্জীবিত হই । “গল্পের ঝুলি” পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন