“মায়ের ভালোবাসার গল্প” কখনো লেখা হয় না, কখনো বলা হয় না । এটাকে শুধু অনুভব করা যায় – নীরবে, নি:শব্দে । ঠিক যেমন অন্বেষার মা স্নেহা তার ডায়েরীর পাতায় লিখে রেখে গেছেন ।
কোলকাতার শ্যামবাজার । ২০১৫ সালের নভেম্বরের শীতকালের এক সন্ধ্যা । বহুদিনের পূরানো দোতলা বাড়ির দক্ষিণের ঘরটিতে মৃদু বাতাস আসছে । ঘরের জানালার ধারে রাখা একটা চৌকির উপর রাখা একটা স্টিলের ট্রাঙ্ক যেন বহু পুরানো কথা চেপে রেখেছে ।
অন্বেষার বাবা অরুণ আজ সন্ধ্যায় সেই ঘর খুলে দিয়েছেন । আর বলেছেন, তোর মায়ের জিনিসপত্র তুই গুছিয়ে নে । আমার পক্ষে আর সামলানো সম্ভব নয় । অন্বেষার মা স্নেহা আজ চলে গেছেন এক বছর হতে চললো – ক্যানসারে ।
অন্বেষা বসে আছে সেই ট্রাঙ্কের সামনে । ট্রাঙ্কটার ঢাকনা খুলতেই পুরানো কাগজ, কাপড়, ন্যাপথালিনের গন্ধ মেশানো একটা অদ্ভুত গন্ধ লাগলো অন্বেষার নাকে । কয়েকটা শাড়ি তার মধ্যে একটা হলুদ. একসঙ্গে বাঁধা কিছু চিঠি, অন্বেষার ছোটবেলার কিছু জামা-কাপড় আর সবার নীচে একটা কালচে নীল রঙের ডায়েরী ।
অন্বেষা কাঁপা কাঁপা হাতে ডায়েরীটা বার করে নেয় । প্রথম পাতায় মায়ের হাতে লেখা : “আমার মেয়ে অন্বেষার জন্য – যদি সে পড়ে ।“ অন্বেষা বুঝতে পারে, এই ডায়েরীর ভেতরেই লুকিয়ে আছে আসল মায়ের ভালোবাসার গল্প – যা তিনি হয়তো প্রকাশ করেননি, শুধু লেখার অক্ষরে কয়েদ করে রেখে গেছেন মায়ের নীরব ভালোবাসার সাক্ষী হিসাবে ।
শিলং যাওয়ার স্বপ্ন ও প্রথম টানাপড়েন
ডায়েরীর প্রথম এন্ট্রি : ১২ই জুন, ১৯৮৫ সাল । অন্বেষার জন্মের প্রায় দু’বছর আগে । স্নেহার বয়স চব্বিশ । সদ্য বিয়ে হয়েছে বছর খানেক হলো । তার স্বামী অরুণ অফিসের চাকরিতে শিলং ট্রান্সফারের নির্দেশ পেয়েছে । অরূণ স্নেহাকে সেখানে নিয়ে চায় । কিন্তু স্নেহার বাবা-মা রাজি নন । তাদের বক্তব্য – “মেয়েকে এতদূরে অচেনা জায়গায় পাঠানো ঠিক নয়।“
স্নেহার কথা, স্নেহার মনের কথা কেউ জানতেও চায়নি । স্নেহা লিখেছে – “আজ অরুণ জানালো, তার ট্রান্সফার হয়েছে শিলংয়ে । অরুণ আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চায় । মা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন, তাঁর চোখে জল । বাবা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তিনি স্নেহাকে পাঠাতে রাজি নন । আমি কি করবো ? অরুণের চোখে ভালোবাসা আর নতুন জীবনের স্বপ্ন, তা নিভিয়ে দিতেও পারছি না । আবার বাবা-মায়ের চোখের জলও দেখতে পারছি না । পরদিন রান্নাঘরে পেঁয়াজ কাটতে কাটতে চোখের জল ফেললাম, যাতে কেউ আসল চোখের জলকে চিনতে পারে না । শিলং যাওয়ার আগের দিন রাতে অরুণ বললো, “আমি গিয়ে তোকে টিকিট কেটে পাঠিয়ে দেবো, তুই আসবি তো স্নেহু ?” আমি শুধু মাথা নেড়েছিলাম । বুঝেছিলাম, মায়ের ভালোবাসার প্রথম পাঠ – “নিজের ইচ্ছের চেয়ে অন্যের দু:খ, ইচ্ছার মূল্য দেওয়া আগে ।“
এই অবধি পড়ে থমকে যায় অন্বেষা । তার মা তো তাকে কখনো এই কথা শেখায়নি । বরং মা সবসময় বলতেন, “সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মাথা ঠান্ডা করে চুপ করে ভাবিস, রাস্তা পেয়ে যাবি ।“ আজ সে বুঝতে পারে, মা নিজে কত বিষয়ে চুপ করে থেকেছে কিন্তু মনে মনে কতো কেঁদেছে ।
ডায়েরীর দ্বিতীয় এন্ট্রি : ফেব্রুয়ারী মাস, ১৯৮৬ সাল । অবশেষে বাবা-মা রাজি হয়েছেন । স্নেহা শিলং গিয়ে থাকবে অরুণের সাথে । তবে শর্ত – মাস দু’য়েক অন্তর অন্তর কোলকাতায় এসে দেখা করতে হবে । স্নেহা লিখেছে – “বাবা-মা ট্রেনে তুলতে এসে আজ আমার হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললো, পাহাড়ের ঠান্ডায় সাবধানে থাকিস, নতুন জায়গা-নতুন লোকজন বুঝে চলবি ।“ আমার কান্না পেয়েছিলো, কাদতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তবুও কাঁদিনি । মনে পড়েছিলো, মায়ের কথা, “মেয়েরা কাঁদলে বাবারা ভেঙে পড়ে ।“ আমি জোর করে হলেও হেসেছিলাম । ট্রেন ছাড়লে দেখেছিলাম বাবা-মা দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন, আমিও হাত নেড়েছিলাম । অরুণ দাঁড়িয়ে থাকবে স্টেশনে, আমার অপেক্ষায় । নতুন জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ট্রেন যাত্রায় পাড়ি দিয়েছিলাম ।
অন্বেষার চোখ ভিজে আসে । সে তার দাদু-দিদাকে মনে করতে পারে না । তার মনে নেই । কিন্তু এই ডায়েরী যেন তাদের ভালোবাসার গভীরতা বোধ, অনুভূতিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে ।
অন্বেষার আগমন, ১৯৮৮
১৯৮৯ সালের ২রা আগস্ট । অন্বেষার প্রথম জন্মদিন । ডায়েরীতে স্নেহা লিখেছে, “আজ আমার মেয়ের প্রথম জন্মদিন । ওর জন্য নীল পাড়ের সাদা ফ্রকটা নিজে হাতে সেলাই করে ডিজাইন করেছি । ও পরলে ঠিক পরীর মতো লাগছে । অন্বেষা যখন হাসে, ওর নির্মল হাসিটা দেখে আমার সব কষ্ট ধুয়ে মুছে যায় । সকালে অরুণ ওকে কাঁধে বসিয়ে প্রায় পুরো শিলংটা ঘুরিয়েছে । দুপুরে বাবা-মা এসে পৌঁছেছেন নাতনীর জন্মদিন উপলক্ষ্যে । প্রথমে এসেই যখন অন্বেষাকে কোলে নিয়েছিলেন, মায়ের চোখে জল দেখেছিলাম । জানিনা, কিসের জন্য । হয়তো মেয়ে হওয়ার নয়তো নাতনীকে প্রথমবার দেখার আনন্দে । শুধু বুঝেছিলাম, মায়র ভালোবাসার গল্প চিরন্তন, যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে নি:শব্দে, চুপিচুপি তা বাহিত হয়ে চলে ।“
অন্বেষা তার মায়ের হাতের লেখাগুলোয় হাত বোলায় । সে ভাবতে থাকে, যখন তার মা এই লেখাগুলো লিখেছিলেন, তখন তার কতোই বা বয়স হবে ? ছাব্বিশ অথবা সাতাশ । অথচ কি উপলব্ধি! হয়তো অনেক লড়াই, অনেক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তা এসেছিলো । অথচ সে তার মাকে বেশিরভাগ সময়েই চুপচাপ হয়ে থাকতে দেখেছে । সে বড় হওয়ার পরে মা যেন আরো বেশি করে চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলো । হয়তো তার মধ্যেও এসেছিলো নি:সঙ্গতা, একাকীত্ব । হয়তো তারই উচিত ছিলো মায়ের বন্ধু হয়ে ওঠা, যা সে পারেনি । অন্বেষার মধ্যে মায়ের জন্য একটা খারাপ-লাগা জমাট বাঁধতে থাকে ।
নি:সঙ্গতা ও যুদ্ধ
১৯৯১ সাল । “কোলকাতায় ফিরে এসেছি । অরুণ রয়ে গেছে শিলংয়ে । খুব চেষ্টা করছে কোলকাতায় বদলি হওয়ার । বাবার খুব শরীর খারাপ । জানি না, কি হবে । গত রাত থেকে অন্বেষারও খুব জ্বর হয়েছে । অরুণ খুব ব্যস্ত কয়েকদিনের জন্য অফিসের কাজে । তাও ফোন করেছে বার কয়েক । মা বাবাকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে গেছেন । বাড়িতে আমি একা কাটিয়েছি বিকালে মা-বাবা না ফেরা পর্যন্ত । সারাদিন মেয়েটার কাছে বসে ছিলাম । সারা রাত পরে জ্বরটা কমলে মনে হলো, যেন একটা যুদ্ধ জিতলাম । মায়েরা কতো যুদ্ধ জেতে, কতো যুদ্ধে কতোরকম অবস্থায় লড়তে হয়, তার কোন ইতিহাস নেই । শুধু এই ডায়েরীর লেখাগুলো জানবে আর না-বলা কথাগুলো ভবিষ্যতে তুলে ধরবে আমার মেয়ের কাছে । হয়তো তাকেও লড়তে হবে এই ধরনের কতো লড়াই ।“
অন্বেষার চোখের কোণ ভিজে যেতে থাকে । স্বামী বাইরের শহরে, চাকরী-জীবিকার জন্য ব্যস্ত । একটা শিশুকে নিয়ে তার মায়ের এই যুদ্ধের কাহিনী আজ তাকে ভাবায় । হয়তো তিনি কতো নি:সঙ্গ ছিলেন । তবুও তাকে বুকে আঁকড়ে লড়াই করে গেছেন । হয়তো এটাই মায়ের ভালোবাসার গল্পের আসল রূপ – যুদ্ধের গল্প, পদকহীন-সম্মানবিহীন সৈনিকের কাহিনী । যা থেকে যাবে চিরকাল শব্দহীন ।
চিঠি ও বাবার রোমান্টিকতা
ডায়েরীর মাঝামাঝি একটা ভাঁজ করা চিঠি পায় অন্বেষা । চিঠিটা বাবার লেখা, শিলং থেকে, ১৯৯১ সালে :
“স্নেহু,
আজ এখানে সারা দিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে । তোকে বলেছিলাম, একটা সোয়েটার বুনে দিতে এইরকম দিনগুলোর জন্যই । তোর বুনে দেওয়া সেই গাঢ় নীল সোয়েটারটা আজ খুব কাজে লেগেছে । ওটা পরে অফিসে যাওয়ার পরে সবাই সোয়েটারটার খুব প্রশংসা করেছে । আমারও খুব ভালো লাগছিলো, মনে হচ্ছিলো, তোর হাতের পরশ নিয়ে ঘুরছি ।
অন্বেষার কাশিটা সেরেছে ? ওর বেশ কিছু ছবি তুলে রাখিস আমার জন্য । আমি ওর বড় হওয়ার এই মূহুর্তগুলো মিস করলাম ।
তোর নিশ্চুপ ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি । শুধু ফোন নয়, চিঠি লিখিস । চিঠিতে যখন তুই লিখিস – “চুপিচুপি ভালোবাসা”, তা দেখলে আমি শক্তি পাই ।
- তোর অরুণ
অন্বেষা ভালো লাগা আর মন খারাপ করা মেশানো একটা অদ্ভুত অনুভূতি হতে থাকে । তার এই বাবা, যিনি এখন রিটায়ার্ড, রোজ সকালে খবরের কাগজ নিয়ে বসেন, বিকালে ঘুরতে বেড়োন – সেই বাবাই মা’কে এত রোমান্টিক চিঠি লিখতেন ? এত মন-খারাপ করা কষ্টের মধ্যেও তাদের ভালোবাসার বন্ধন ছিল যেন অপার-অমোঘ । সে ধীরে ধীরে যায় তার বাবার ঘরে । বাবা তখন চা খাচ্ছিলেন । অন্বেষা জিজ্ঞাসা করে, “বাবা তুমি মা’কে ‘স্নেহু’ বলে ডাকতে ?” বাবা একটু থমকে যান । তারপর মৃদু হেসে বললেন, “হ্যাঁ, ডাকতাম । মনে মনে এখনও এই নামেই ডেকে তার সঙ্গে কথা বলি ।“
অন্বেষা তার হাতের চিঠিটা দেখায় । বাবার চোখ যেন ঝাপসা হয়ে ওঠে । প্রায়-ভেজা চোখে তিনি বলেন, “তোর মা সব রেখে দিতো ।“ বলতো, “একদিন এগুলো অন্বেষার কাজে লাগবে । আমি তখন বুঝিনি-আজ বুঝলাম ।“ অন্বেষা বাবাকে জড়িয়ে ধরে । বাবার বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ওঠে । আসলে সে বুঝতে পারে, সাধারণ মধ্যবিত্তের লড়াইয়ের মধ্যেও ভালোবাসার মাধুর্য । বুঝতে পারে – মায়ের ভালোবাসার গল্প শুধু মা-মেয়ের ভালোবাসার গল্প নয়, বাবা-মায়েরও । যেখানে একাকীত্ব, সন্তানের থেকে দূরে থাকার কষ্ট, রোমান্টিক চিঠি, সামান্য একটা সোয়েটার আর নিশ্চুপ ভালোবাসা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় । সে বোঝেনি, আজ বুঝছে । আর তাই তার চোখে জল চলে আসে । কারণ তার পরের অধ্যায়টাও সে ডায়েরীতে পড়ে ফেলেছিলো ।
কিশোরীর বিদ্রোহ ও মায়ের চুপ থাকা
তার পরের পৃষ্ঠাগুলোয় লেখা ছিলো ১৯৯৫-১৯৯৬ সালের কথা । অন্বেষার বড় হওয়ার কথা । তার স্কুল, সকালের ব্যস্ততায় টিফিন তৈরীর লড়াই, অন্বেষার পরীক্ষার কথা ।
ডায়েরীর পাতা ওল্টাতে থাকে অন্বেষা । সময় এগোতে থাকে – অন্বেষা বড় হতে থাকে । তার স্কুলে যাওয়া, তার টিফিন তৈরী, পরীক্ষার সময়ের লড়াই – সব লিখে রেখেছে মা ।
অন্বেষা তখন ক্লাস নাইনে উঠেছে । তারপরে লেখার ধরন বদলাতে থাকে । আসলে মায়ের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে, মতের অমিল হতে শুরু করেছে । এক জায়গায় স্নেহা লিখেছে – “আজ অন্বেষা আমায় বললো, ‘মা, তুমি তো কিছুই বোঝো না । তোমার কোন বন্ধু নেই, কোন শখ নেই, তোমার কোন অ্যাচিভমেন্ট নেই, তুমি শুধু সংসার করো ।‘ আমি চুপ করেছিলাম । রাতে যখন ও ঘুমিয়ে পড়লো, ওর চুলে বিলি কাটতে কাটতে কাঁদলাম । তবু ওকে বলতে পারলাম না, আমার শখ-স্বপ্ন-সাধ সব ছিলো ওকে বড় করা । ওকে বলতে পারলাম না, ওর হাসি-গর্ব দেখলেই আমার সব ক্লান্তি-কষ্ট দূর হয়ে যায় । মায়ের ভালোবাসার গল্প তৈরী করতে এরকম কতো চুপ করে থাকতে হয়, এরকম কতো শখ-আহ্লাদ-সাধ-স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়, সদ্য কিশোরী মেয়েকে কি করে বোঝাবো ? বড় হলে ও সব বুঝে যাবে । বুঝে যাবে আমার এই ডায়েরীর মাহাত্ম্য ।“
অন্বেষা পড়ে লজ্জায় মাথা নীচু করে । তার মনে পড়ে যায়, সে একবার মাকে বলেছিলো, “তুমি তো সংসারের গোলাম।“ মা তখন চা বানাচ্ছিলো । তার হাত থমকে গিয়েছিলো, কিন্তু মুখে কিচ্ছু বলেননি । শুধু একটু নীরব হাসি হেসেছিলেন । সেই হাসির নীচে কি পরিমাণ মর্মান্তিক যন্ত্রণা ছিলো, তখন সে বোঝেনি । আজ ডায়েরী পড়ে সে যেরকম বুঝতে পারলো । তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিলো ।
তারপরে বেশ কিছুদিন লেখা নেই । অনেক মাস পরের একটা লেখা : “অন্বেষা আজ আমায় বললো, ‘মা, তোমার চোখে কোন স্বপ্ন নেই, কোন কিছু করার ইচ্ছা নেই ।‘ আমি কোন উত্তর দিতে পারিনি । কারণ ও এখন বুঝতে পারবে না, আমারও একসময় স্বপ্ন ছিলো মাস্টার ডিগ্রী শেষ করে স্কুলের শিক্ষিকা হবো, লেখা-লিখি করবো । বিয়ের পরে প্রথম প্রথম আক্ষেপ হতো । তারপরে ও আসার পরে আমার সব স্বপ্ন-ইচ্ছা ওর চোখেই বাঁচে । ও যখন পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে, আমার স্বপ্ন পূরণের আশা জেগে ওঠে । ওর হাসিতেই আমার পৃথিবী আলোময় হয়ে ওঠে । ওকে এখন কি করে বোঝাই ? যখন ও একদিন নিজেই বড় হবে, মা হবে, তখন বুঝবে – মায়ের ভালোবাসার গল্পে সব স্বপ্ন-ইচ্ছা বেঁচে থাকে, মিশে যায় সন্তানের ইচ্ছায়-স্বপ্নে ।“
অন্বেষার নিজেকে অপরাধী মনে হয় । তার মনে হয়, কেন সে তখন মাকে বোঝার চেষ্টা করেনি, মায়ের বন্ধুত্ব মেনে নেয়নি । এখন সে বড় হয়েছে । কিন্তু তখন, কেন সে মাকে এত কষ্ট দিয়েছিল ?
মায়ের শেষ লড়াই
চোখের জল মুছে আবার ডায়েরীর পাতা ওল্টায় অন্বেষা । দীর্ঘ সময় ধরে কোন লেখা নেই । তারপরে হঠাৎ একটা ছোট্ট এন্ট্রি :
“আজ ডাক্তার বললো, রিপোর্ট ভালো নয়, ওষুধে আর হবে না, এবারে কেমোথেরাপি করতে হবে । অরুণকে বলিনি কিছুই, আমি তো অনেকদিন আগে থেকেই জানি, একদিন এই দিনটা আসবে । আসলে ও এখন একটু টাকা-পয়সা নিয়ে চিন্তিত । অন্বেষা কলেজে উঠেছে, ওর উচ্চশিক্ষা-বিয়ে-ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে । তার জন্য টাকা দরকার । অরুণেরও বয়স হচ্ছে, আর বেশিদিন কাজ করে উঠতে পারবে না । এই সময় অরুণকে কিছু বলা মানে সংসারের উপর, অরুণের উপর চাপ বাড়ানো । মায়ের ভালোবাসার গল্পের সবচেয়ে বড় অধ্যায় হলো – আত্মত্যাগ । মায়েদের অনেক সময় চুপ করে থাকতে হয় । তাই আমি চুপ করে থাকাই ভালো । আমি চুপিচুপি, নীরবে চলে যেতে চাই ।“
অন্বেষার শ্বাস-প্রশ্বাস যেন থেমে যায় । তার মানে মা অনেক আগে থেকেই জানতো ? প্রায় ছয়-সাত বছর আগে থেকে । কিন্তু কাউকে কিচ্ছু বলেনি, জানায়নি । শুধু সহ্য করে গেছে । কিসের জন্য ? কাদের জন্য ? কার জন্য ? অন্বেষা যেন পাগলের মতো উত্তর খুজতে চেষ্টা করে ।
বেশ কয়েকটা ফাকা পাতা উল্টে পেয়েও যায় তার উত্তর । সেখানে লেখা : “আজ অন্বেষা ফোন করেছিলো, আমায় জিজ্ঞাসা করছিলো, ‘মা, তুমি কেম আছো?’ আমি বললাম, ‘ভালোই আছি’ । মিথ্যা বললাম, কারণ ওর পরীক্ষা চলছে । আমি চাই না ওর পড়ায় কোনরকম ব্যাঘাত ঘটুক । ও পরীক্ষা দিয়ে উঠুক । তারপরে ও হয়তো বাড়িতে এলে নিজেই সব জানতে .... । আর এটুকু মিথ্যা বলা তো মায়ের ভালোবাসার গল্পে স্বাভাবিক ঘটনা । হয়তো যখন ও বাড়ি আসবে ..... হয়তো দেরী হয়ে যাবে ।“
দুটো পাতা ছেড়ে আবার লেখা, লেখাটা যেন একটু কাঁপা কাঁপা : “যদি কখনো অন্বেষা এই ডায়েরী পায়, এই আশায় লিখছি । জানিস বাবা, তোকে মা যতোটা ভালোবেসেছে, তা কখনোই বলতে পারেনি । বলা যায়নি, বোঝানো যায়নি-সে ভালোবাসা কতোটা । কিন্তু কিছু ভালোবাসা কথার চেয়েও বেশি শক্তিশালী । তুই যখন এই ডায়েরী পাবি, তখন তার গভীরতা বুঝতে পারবি । তুই যখন আমায় ‘মা’ বলে ডাকতিস, তাতেই তোর সব প্রশ্নের উত্তর আছে । কয়েকদিন খুব কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু তোর সঙ্গে দেখা হবে, একসঙ্গে চা খাবো, কথা বলবো, এই আশায় নিজের সঙ্গে লড়াই করছি । জানি না, শেষ বারের মতো দেখে যেতে পারবো কিনা । তবু তোকে বিরক্ত করবো না । আমার নীরব, চুপিচুপি ভালাবাসা নিস – ‘মা’ ।“
অন্বেষা আর পারলো না । সে ছুটে পাশের ঘরে গিয়ে ডায়েরী হাতে বাবার বুকে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে থাকে । অরুণ ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে, “তোর মা চেয়েছিলো, তুই যখন বুঝবি ভালোবাসার গভীরতা-মাহাত্ম্য, তখন যেন এই ডায়েরী তুই পড়িস ।“ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, যখন জানতে চাইতাম “ডায়েরীতে কি লিখে রাখছো ?” সে বলতো, “ভালোবাসা যেমন গড়ে, তেমন ভাঙেও । সেই ভাঙনের ধাক্কা সামলানোর জন্য মেয়েকে তৈরী করে রাখতে হবে ।“
অন্বেষা বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্নার মধ্যেই বলে, “বাবা, মা আসলে দুনিয়ায় সোনা-দানা-সংসার-সাধ-স্বপ্ন-ইচ্ছা-আহ্লাদ সব কিছুর থেকে আমায় বেশি ভালোবাসতো । আমি কেন বুঝিনি, আমায় কেন বোঝানোর চেষ্টা করেনি ।“
বাবা অন্বেষার চোখ মোছাতে মোছাতে বলেন, “আজ তুমি যা বুঝছো, সেটাই তো আসল মায়ের ভালোবাসার গল্প, যা কখনো শেষ হয় না ।
উত্তরাধিকার ........
সেদিন সারা রাত অন্বেষা ডায়েরীটা জড়িয়ে শুয়ে থাকে । বারবার হাত বোলায়, ডায়েরীর উপর, পাতা উল্টে হাতের লেখাগুলোয় । তার মনে হয়, সব যেন মা নিজে কথা বলছে । শেষ রাতে সে যেন অনুভব করে, মা তো চলে যায়নি । মা তো বেঁচে আছেন তারই মধ্যে, তারই সত্ত্বায় । এ কালচে রঙের ডায়েরীর প্রতিটা পাতায় পাতায়, প্রতিটা লেখায় । সে ঠিক করে কাল সকালে সেও একটা ডায়েরী কিনে আনবে । আর লিখে রাখবে মায়ের মতোই, মেয়ের জন্য .....
তৈরী হবে আরও একটা মায়ের ভালোবাসার গল্প ।
"গল্পের ঝুলি" ব্লগ ভিজিট করার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ । যদি "গল্পের ঝুলি"র ভিন্ন স্বাদের গল্পগুলি পড়তে চান তাহলে ভিজিট করুন নীচে দেওয়া ট্যাগ গুলিতে ।
# কল্পবিজ্ঞানের গল্প # # জীবন অনুভূতির গল্প # # সিরিজ গল্প # # ছোট গল্প #
# ভৌতিক গল্প # # রহস্য গল্প # # শিক্ষণীয় গল্প #

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন