আগের পর্বে যা ঘটেছিল...
২০৮০ সালের কলকাতা। আবহাওয়াবিদ অনির্বাণ তৈরি করেছিল "মেঘদূত ১.০"; মেঘ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র। পরীক্ষায় সফল হলেও তিনি আবিষ্কার করেন, মেঘের ভেতর লুকিয়ে আছে ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান বার্তাবাহক। মেঘ নিয়ন্ত্রণের অর্থ যুদ্ধের ঘোষণা। সরকার তাকে বৃষ্টি আনার চাপ দেয়, আর ঠিক সেই সময় আকাশে দেখা দেয় সোনালি আলোর মেঘপুঞ্জ। প্রথম পর্ব শেষ হয়েছিল প্রশ্ন নিয়ে ধ্বংস না শান্তি ?
দ্বিতীয় পর্বে পড়ুন : সোনালি আলোয় নেমে আসা বার্তাবাহকদের মুখোমুখি অনির্বাণ ও প্রশাসন। শর্ত বনাম প্রতিশ্রুতি, আর এক নতুন ভোরের সম্ভাবনা।
সোনালি আলোর বার্তা
সচিবালয়ের কাঁচের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে অনির্বাণ দেখতে পায়, পশ্চিম আকাশ থেকে ক্রমশ: এগিয়ে আসছে সেই বিশাল সোনালি মেঘপুঞ্জ । ঘরের ভেতর সবাই নিঃশব্দ । মুখ্যমন্ত্রীর হাত কাঁপছে, বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টার কপাল ঘামছে, পুলিশ কমিশনার বারবার মোবাইলে খবর নিচ্ছেন ।
আকাশের মেঘটা ঠিক সচিবালয়ের ওপর এসে থামলো । তারপর যা ঘটলো, তা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনও ঘটেনি—মেঘের গা বেয়ে নামতে শুরু করল সোনালি আলোর রশ্মি, ঠিক যেন কোনো অদেখা সিঁড়ি । আর সেই আলোর পথ ধরে নেমে এল তারা—আমাদের মেঘের ভেতরকার বার্তাবাহকরা বা বার্তাপ্রেরকরা ।
নীচে জনতার মধ্যে মানুষ চিৎকার করতে লাগলো – কেউ ভয়ে, কেউ অজানা-আচমকা দেখা এই ঘটনার শকে । সচিবালয়ের ভেতরেও অনেকেই জানলা থেকে সরে গেলো । কিন্তু অনির্বাণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো । সে জানতো, এটাই সেই মুহূর্ত যা সারাজীবনের চোরাকুঠুরিতে রয়ে যাবে ।
আলোর আবরণ সরে যেতেই দেখা গেল তাদের—তারা দেখতে অনেকটা মানুষের মতোই, কিন্তু স্বচ্ছ, যেন কাঁচের তৈরী । তাদের দেহের ভেতর দিয়ে শিরা-উপশিরার মতো বয়ে চলেছে সবুজ ও নীল আলোর স্রোত । তাদের চোখ দুটো বড় বড়, শান্ত, জ্ঞানী । তাদের একজন সামনে এগিয়ে এলো । তিনি মুখ না খুললেও তার কথা ভেসে এল সবার মনের ভেতর—"আমরা শান্তি চাই । কিন্তু তোমাদের সতর্কও করতে এসেছি ।"
পৃথিবীর আয়না
অনির্বাণ এগিয়ে গেলো । "আমরা শত্রু নই । এই যন্ত্র আমি তৈরি করেছিলাম খরা দূর করতে, কাউকে আঘাত করতে নয় ।"
বার্তাবাহক মাথা নেড়ে জানলার বাইরে হাত নাড়িয়ে যেন একটি ছবি আঁকলো । সঙ্গে সঙ্গেই আকাশ জুড়ে ভেসে উঠলো এক বিশাল স্ক্রিনে চলমান ছবি—আমাদের পৃথিবীর ইতিহাস । আদিম বন, সবুজে ভরা মহাদেশ, বিশাল বিশাল গাছ । তারপর হলো মানুষের আগমন । ছবি বদলাতে থাকল—আগুন জ্বালানো শেখা, চাকা আবিষ্কার, গাছ কাটা, কলকারখানার কালো ধোঁয়া, প্লাস্টিকের পাহাড়, বিষাক্ত নদী, সমুদ্রে মরে ভেসে ওঠা সামুদ্রিক প্রাণী । গোটা সচিবালয় যেন থমকে নিস্তব্ধ, নিশ্চুপ হয়ে গেলো ।
"আমরা দেখেছি । লক্ষ বছর ধরে দেখছি । তোমরা যে বাগানের অংশ, সেই বাগানই তোমরা নিজেরাই ধ্বংস করছো । অনুভবই করতে ভুলে গেছো সৌরজগতে খুব কম গ্রহে গাছ, বায়ু, জল আছে । যে পৃথিবী তোমাদের সব দিয়েছে, তোমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞতা হারিয়ে ফেলছো ।" বার্তাবাহকের কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই, শুধু অসীম করুণা ।
মুখ্যমন্ত্রী এগিয়ে এলেন, গলা শুকিয়ে গেছে তাঁর । "আমরা... আমরা বুঝতে পারছি । কিন্তু এখন তো খরা চলছে । মানুষ ধুঁকছে জলের অভাবে, চাষী হাহাকার করছে, চাষের ক্ষেতে ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে । এখন আমাদের কী করা উচিত ?"
বার্তাবাহক জানালার কাছে এলো । নীচের জনতার দিকে তাকিয়ে বললো, "তোমরা কি জানো, পৃথিবীর প্রতিটি গাছ তোমাদের ফুসফুস ? প্রতিটি পাতা তোমাদের অক্সিজেন ? প্রতিটি শিকড় তোমাদের ভূমি ধরে রাখে ? কিন্তু তোমরা সেই গাছই কেটে ফেলছো ? খরা তোমাদের শাস্তি নয়, খরা তোমাদের কর্মফল ।"
প্রতিশ্রুতির ভোর
অনির্বাণ বুঝতে পারল, এই সভ্যতা কোনো আক্রমণ করতে আসেনি । তারা এসেছে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে যে, আমরা নিজেরাই নিজেদের শত্রু ।
"আমরা নিজেদের বদলাতে চাই । সত্যি বলছি ।" অনির্বাণ চোখে জল নিয়ে কাতর স্বরে বললো, "শুধু একটা সুযোগ দাও । দেখো আমরা পারি কি না ।"
বার্তাবাহকরা পরস্পরের দিকে তাকালো । তাদের মধ্যে যেন নীরব আলাপ চললো কয়েক মূহুর্ত । তারপর প্রথম বার্তাবাহক বললো, "আমরা বৃষ্টি দেবো । কিন্তু শর্ত আছে ।"
মুখ্যমন্ত্রী দ্রুত বলে উঠলেন, "যে কোনো শর্ত মানতে আমরা রাজি ।"
"প্রথম শর্ত—আগামী পাঁচ বছরে এই রাজ্যে দশ লক্ষ গাছ লাগাতে হবে । দেশি প্রজাতির গাছ, ফলদ গাছ, বনজ গাছ । যেগুলো তোমাদের বাতাস পরিষ্কার করবে, মাটি ধরে রাখবে ।"
জানলার দিকে তাকিয়ে বার্তাবাহক আবার বললো, "দ্বিতীয় শর্ত—প্লাস্টিক বন্ধ করতে হবে – সম্পূর্ণরূপে । আজ থেকে এক বছরের মধ্যে ।"
পুলিশ কমিশনার মাথা নেড়ে বললেন, "এটা কিন্তু খুব কঠিন..."
"কঠিন বলেই তো বলা হচ্ছে । সহজ কাজ করাতে তো আমরা এখানে আসিনি । আর আজ তোমরা যেখানে নিজেদের নিয়ে এসেছো, সবই কঠিন কাজ । নিজেদের বদলানো সহজ নয় ।" বার্তাবাহকের কথায় কোনো রসিকতা নেই, বরং প্রচ্ছন্ন ধমকের সুর ।
মুখ্যমন্ত্রী সাহস সঞ্চয় করে বললেন, "আমরা আপনাদের শর্ত মেনে নিচ্ছি । রাজ্য সরকার সব রকম উদ্যোগ নেবে এবং উদ্যোগকারীদের সাহায্য করবে ।"
"তৃতীয় শর্ত—শিক্ষা । প্রতিটি স্কুলে সপ্তাহে একদিন শুধু প্রকৃতির জন্য বরাদ্দ করতে হবে । গাছ লাগানো, নদীকে বাঁচানো, মাটিকে ভালোবাসা—এটা পাঠ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ।"
অনির্বাণ মাথা নেড়ে বলল, "আমি নিজে পড়াবো, যদি দরকার হয় ।"
হুঁশিয়ারির সুর
বার্তাবাহক শেষবারের মতো সবাইকে দেখে নিলো । তারপর বললো, "বৃষ্টি নামবে আজ রাতেই । কিন্তু মনে রেখো, আমরা দেখবো । আমরা সব সময়ই দেখছি । এই প্রতিশ্রুতি ভাঙলে, পরের বার কোনো বার্তাবাহক আসবে না । পরের বার আসবে ধ্বংস । আর তার দায় তোমাদের নিজেদেরই ।"
সোনালি আলো আবার জ্বলে উঠলো । বার্তাবাহকরা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল মেঘের ভেতর । আর তার কিছু পরেই সারা আকাশ কেঁপে উঠলো—প্রথম বজ্রপাত । গুড়ুম গুড়ুম শব্দে কেঁপে উঠল সচিবালয় এবং চারিদিক । তারপর ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি । জনতা চিৎকার করে উঠলো— বৃষ্টি, বৃষ্টি, বৃষ্টি ! খরার শেষ !
অনির্বাণ জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো । বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজছে শহর, আর তার মনে ভাসছে সেই হুঁশিয়ারি—"আমরা দেখবো ।"
মুখ্যমন্ত্রী পাশে এসে দাঁড়ালেন । "কী ভাবছো, অনির্বাণ ?"
"ভাবছি, এই প্রতিশ্রুতি রাখা কতটা কঠিন হবে । গাছ লাগানো সহজ, কিন্তু মানুষকে বদলানো... মন থেকে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখানো... সেটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে ।"
মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিলেন, “চিন্তা নেই, তুমি প্ল্যান বানাও, আমি পাশে থাকবো ।“
শেষ নয়, শুরু .....
রাতভর প্রবল বৃষ্টির পর সকালটা সম্পূর্ণ অন্যরকম । সকালে খবরের কাগজে বড় শিরোনাম—"ভিনগ্রহের বার্তায় খরা কাটল কলকাতার"। কিন্তু অনির্বাণ জানে, আসল খবরটা অন্য । সে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লো । গাছের চারা কিনবে, প্রথম গাছটা নিজে লাগাবে ।
পথে দেখে, একদল ছাত্রছাত্রী প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে—"আমরা বদলাতে চাই"। তাদের চোখে উৎসাহ, ভবিষ্যতের স্বপ্ন । অনির্বাণ হাসলো । কঠিন পথ, কিন্তু অসম্ভব নয় ।
বৃষ্টিস্নাত আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘ । কেউ জানে না, কোন মেঘ শুধু জল নিয়ে আসে, আর কোন মেঘ লুকিয়ে রাখে সেই সভ্যতার চোখ । কিন্তু অনির্বাণ জানে—সব মেঘেরই এখন নতুন অর্থ । সব বৃষ্টির ফোঁটায় লুকিয়ে আছে এক প্রতিশ্রুতি, আর এক হুঁশিয়ারি ।
রাতের আকাশে তারা জ্বলে । অনির্বাণ বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে । হাতে একটা কলম, ডায়েরিতে লিখছে—"আজ থেকে শুরু । গাছের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে, নিজেদের সঙ্গে নতুন করে চেনার পালা । পৃথিবী বাঁচবে, যদি আমরা বাঁচতে চাই – বাঁচাতে চাই ।"
আকাশে কোথাও যেন হালকা আলো জ্বলে উঠলো । মিটমিট করে উঠে আবার নিভে গেল । যেন কেউ বলে উঠলো —"আমরা কিন্তু সব দেখছি ।"
(পরের পর্ব পড়ুন...)
পরবর্তী পর্বে : পাঁচ বছর পর । অনির্বাণের প্রকল্প কতটা সফল হলো ? প্লাস্টিক বন্ধের আইন কি মানছে মানুষ ? সেই ভিনগ্রহের সভ্যতা কী আবার যোগাযোগ করবে ? জানতে পড়ুন "মেঘের বার্তাবাহক (তৃতীয় পর্ব)"—যেখানে প্রশ্ন হবে, "প্রতিশ্রুতি রেখেছো কি ?"
যদি আগের পর্ব না পড়ে থাকেন - মেঘের বার্তাবাহক (প্রথম পর্ব)
লেখকের নোট : প্রিয় পাঠক, কেমন লাগলো দ্বিতীয় পর্ব ? প্রকৃতির প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ নিয়েই এই গল্প । আপনিও যদি একটি গাছ লাগান, তবে সেই প্রতিশ্রুতি রাখা হবে । আপনার একটি গাছই পারে পৃথিবী বদলে দিতে। মতামত জানাতে ভুলবেন না । “গল্পের ঝুলি”তে আবার দেখা হবে ।
আপনার মূল্যবান মতামত জানান :
এই পর্ব কেমন লাগলো? বার্তাবাহকদের শর্তগুলো কি বাস্তবসম্মত? আপনি কি প্রকৃতি বাঁচাতে নিজের অভ্যাস বদলাতে রাজি? নিচে কমেন্ট বক্সে জানান। গল্পটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন ও বন্ধুদের পড়তে দিন।
.jpg)
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন