🔥 বাংলা কল্পবিজ্ঞানের গল্প | সিরিজের প্রথম পর্ব

সময়টা ২০৮০ সাল। কোলকাতা শহর। জুন মাস পড়ে গেলেও আকাশে কাঁসা-ঘড়ির মতো সূর্য ঝকঝক করছে, কোথাও এক ফালি মেঘও নেই। আলিপুর আবহাওয়া অফিসের কাঁচের দেওয়ালের অন্যপারে সূর্য এমনই নির্মম যে, এ.সি চালু থাকা সত্ত্বেও ঘামছে মানুষ-যন্ত্রপাতি। সেই অফিসেরই এক কোণায় নিজের হাতে গড়া একটি যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে অনির্বাণ। চোখ দু’টো ক্লান্ত, কিন্তু তবুও নিবিড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে যন্ত্রটার দিকে – যার নাম সে দিয়েছে “মেঘদূত ১.০”

অনির্বাণ ও তার আবিষ্কার

ছত্রিশ বছর বয়সী আবহাওয়াবিদ অনির্বাণ গত পাঁচ বছর ধরে খুব গোপনে কাজ করেছে তার এই যন্ত্রটি নিয়ে। সেই জন্যে সে বিয়ে-থা অবধি করেনি। সাউন্ড ওয়েভ আর আয়নাইজড পার্টিকলের মাধ্যমে মেঘের ঘনত্ব, গঠন নির্ধারণ এবং গতিপথ নিয়ন্ত্রণ – সংক্ষেপে এই ছিল তার প্রকল্প। বৃহস্পতিবার সকালে যখন প্রথমবার সে পরীক্ষা চালায়, সে মেঘের গতিপথ নিয়ন্ত্রণে সফল হয়। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে থাকা একটি মেঘপুঞ্জকে সে নিজের ইচ্ছামতো ঘুরিয়ে এনে শহরের উপর কৃত্রিম ছায়া তৈরী করতে পেরেছিলো।

আবহাওয়া দপ্তরের বড়কর্তারা সেই খবর পাওয়া অবধি সেই খবর বিভিন্ন সরকারী অফিসে অফিসে ঘুরছে। খরা-পীড়িত বাংলার মুখে হাসি ফোটানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি নয় প্রশাসন। ফল হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ফোন এসেছে – আগামী কালের মধ্যে প্রকল্পের নথি অনুমোদনের জন্য জমা দিতে হবে।

“কিন্তু অনির্বাণের মনে সাফল্য সত্ত্বেও যেন শান্তি নেই। আসলে গত সকালে যখন সে যন্ত্রটি চালাচ্ছিলো, তখন যন্ত্রের স্ক্রিনে কিছু অদ্ভুত সঙ্কেত ধরা পড়েছিলো। শুধু বৃষ্টির কণার অস্তিত্ব নয় বা মেঘের ঘনত্ব নয়, মেঘের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত পালস্ শনাক্ত করছিলো – যেন কোন ছন্দ, কোন কিছুর অস্তিত্বের স্পন্দন।”
বাংলা কল্পবিজ্ঞানের গল্প | মেঘের বার্তাবাহক (প্রথম পর্ব)| কভার ইমেজ

মেঘের বার্তা

চিন্তায় পড়ে যায় অনির্বাণ – “এটা কি করে সম্ভব? মেঘের মধ্যে এটা কি ধরনের সঙ্কেত?” মনে মনে ভাবতে থাকে অনির্বাণ। রাত তখন একটু বেশি। অফিস ফাঁকা হয়ে গেছে। অনির্বাণ আবার একবার যন্ত্রটাকে চালু করলো। একই জিনিস – মেঘের ভেতর থেকে আসা এক অদ্ভুত ছন্দময় সঙ্কেত। তার কৌতুহল চরমে উঠলো। সে যন্ত্রের সেটিংস বদলে দিয়ে সঙ্কেতটাকে ডি-কোড করার চেষ্টা করতে লাগলো। ঘন্টাখানেক চেষ্টা করার পরে, অনির্বাণের কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো কয়েকটি লাইন –

🌩️ “আমরা সব দেখছি। আমরা এসেছি। তোমরা প্রস্তুত তো?”

অনির্বাণের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। সে ভাবে নিশ্চয়ই কোন প্রোগ্রামিংয়ের গোলমাল হয়েছে। সে বারবার পরীক্ষা করতে থাকে। কিন্তু না, যন্ত্র-যন্ত্রের প্রোগ্রামিং এবং সেটিংস সব ঠিক আছে। সঙ্কেতটা সত্যিই মেঘ থেকে আসছে – আক্ষরিক অর্থেই সেটি “মেঘের বার্তা”

পরের কয়েক ঘন্টার প্রয়াসে অনির্বাণ যা আবিষ্কার করে, তা তাকে হতবাক করে দেয়। পৃথিবীর উপর দিয়ে ভেসে বেড়ানো প্রতিটা মেঘ আসলে একেকটি বার্তাবাহক। এরা আসলে কোন উন্নত সভ্যতার দ্বারা প্রেরিত সেন্সর – শত শত বছর ধরে পৃথিবীর আবহাওয়া, বিবর্তন এবং মানবসভ্যতার প্রতিটা পদক্ষেপকে পর্যবেক্ষণ করছে। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তথ্যটা হলো – এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলেই সেই সভ্যতা সেটাকে যুদ্ধের ঘোষণা হিসাবে ধরে নেবে। তার আবিষ্কৃত “মেঘদূত ১.০” যন্ত্রটি সেই অর্থে একটি “যুদ্ধ ঘোষণার বোতাম” হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছে।

পরদিন সকালে অনেক বেলায় ঘুম ভাঙতেই, তার ভাইপো, ছোট বারো বছরের ছেলে ঋষি, এসে খবর দেয় তাকে নাকি টি.ভির পর্দায় দেখাচ্ছে। টি.ভিতে সে দেখতে পায় সরকারের তরফে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, শহরেরই আবহাওয়াবিদ হিসাবে অনির্বাণ নাকি এমন এক যন্ত্র আবিষ্কার করেছে – যে যন্ত্র ব্যবহার করে আগামী সপ্তাহেই নাকি রাজ্যে কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টি করানো যাবে। খবর দেখে অনির্বাণের মাথায় বাজ পড়ে। সে কোনরকমে তৈরী হয়ে দৌড়ায় অফিসে। অফিসের বাইরে বিশাল জনতা জড়ো হয়েছে। সে কোনরকমে অফিসে ঢুকে দৌড়ায় প্রধান আধিকারিকের ঘরের দিকে।

ঘরে ঢুকেই সে বলে ওঠে, “স্যার, যন্ত্রটা ব্যবহার করা যাবে না।”
“কেন অনির্বাণ? তুমিই তো বললে পরীক্ষা সফল হয়েছে। রাজ্যের কি দশা হয়েছে দেখছো না? লক্ষ লক্ষ মানুষ খরায় হাহাকার করছে।”
অনির্বাণ সব কথা খুলে বলে – তার যন্ত্র চালানোর কথা, যন্ত্রের মারফত স্পন্দন খুঁজে পাওয়া, মেঘের ভেতরের বার্তা, সঙ্কেত ডি-কোড করা, সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কা ইত্যাদি। সব কথা শুনে আধিকারিক হাসেন। আর বলেন – “ওহে অনির্বাণ, এখন এই সময় তোমার এই সব কল্পবিজ্ঞানের গল্প বাদ দাও। বাস্তব পরিস্থিতি দেখো। ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির, মানুষ তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত। এইসব ভেবে যন্ত্র চালানোর কথা ভাবো। প্রয়োজনীয় অনুমতির আর্জি চলে যাবে সঠিক দফতরে।”

অফিসে নিজের রুমে এসে অনির্বাণ ভাবতে থাকে। কি করা যায় এখন? সে কি পৃথিবীকে অজানা এক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে? নাকি চুপ করে থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের খরায় মৃত্যুর দায় নেবে? সব শেষে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছায় সে – ওই অজানা সভ্যতার সঙ্গে আবার যোগাযোগ করতে হবে। তাদের জানাতে হবে যে, “আমরা শান্তি চাই”

সে আবার তার যন্ত্র চালায়। এবারে সে বার্তা পাঠায় – “কে তোমরা? কি চাও?”
মিনিট কয়েকের মধ্যেই উত্তর আসে – “আমরা মহাশূন্যের পথিক। পৃথিবী আমাদের পুরানো বাগান। কিন্তু সেখানে তোমরা আগাছা হয়ে উঠছো। তোমরা প্রযুক্তি পেয়েছো, কিন্তু বোধ হারিয়েছো।”

অনির্বাণ অনুমান করে, হয়তো এদের সভ্যতা পৃথিবীর আদি পরিদর্শক। তারা এতদিন শুধু দেখেছে মানুষের বিবর্তন, হস্তক্ষেপ করেনি কখনো। কিন্তু মেঘের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা মানে হচ্ছে, তাদের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ – যা তারা কখনও মেনে নেবে না।

ঠিক সেই সময় তার অফিসের রুমের দরজা খুলে ঢোকে চারজন সশস্ত্র পুলিশ অফিসার এবং তাকে নির্দেশ দেয়, এখুনি অনির্বাণকে তার যন্ত্রসহ সচিবালয়ে পৌছাতে হবে। তারা তাকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে।

অনির্বাণ তাদের সঙ্গে গাড়িতে ওঠার আগে একবার আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকায়। দুপুরের জ্বলন্ত রোদে কোথাও মেঘের চিহ্ন নেই। কিন্তু সে যেন অনুভব করে বহু অদৃশ্য চোখের উপস্থিতি। গাড়ি চলা শুরু করলো, আর অনির্বাণ মনে মনে ভাবতে থাকলো – সচিবালয়ে পৌঁছে সে কি বলবে?

⚡ সচিবালয়ের সাক্ষাৎ

সচিবালয়ের বড় মিটিং রুমে বসে আছেন – স্বয়ং মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা, প্রধান সচিব, রাজ্যের পুলিশ কমিশনার। সবার চোখ অনির্বাণের দিকে। মুখ্যমন্ত্রী তাকে বসতে বলে কোনরকম ভনিতা ছাড়াই সরাসরি জানতে চান – “বলুন ডক্টর অনির্বাণ, আপনি কি আগামীকাল বৃষ্টি নামাতে পারবেন?” তাঁর গলায় জরুরী সুর ফুটে ওঠে।

অনির্বাণ একটা বড় নি:শ্বাস ফেলে আর শুরু করে সংক্ষেপে তার আবিষ্কারের কথা, কিন্তু একটু ভিন্নভাবে। বলে মেঘের ভেতরের স্পন্দনের কথা, বলে সেই সভ্যতার সঙ্গে যোগাযোগের কথা। শেষে বলে – “মাননীয়, আমার এই যন্ত্র ব্যবহার মানেই কিন্তু যুদ্ধের ঘোষণা করা। আর সেই যুদ্ধে আমাদের পরাজয়ের সম্ভাবনা শতকরা ৯৯ শতাংশ। প্রশ্ন হলো, আমরা কি আজকের খরা এড়াতে গিয়ে পুরো মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের ঝুঁকিতে ফেলতে প্রস্তুত?”

সোনালী মেঘ ও তার দূত

মুখ্যমন্ত্রী কিছু বলার আগেই পুলিশ কমিশনারের মোবাইল বেজে ওঠে। তিনি ফোন ধরে অন্য প্রান্তের ব্যক্তির কথা শুধু চুপ করে শুনে যান। তারপরে ফোন রেখে বলেন – “মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র থেকে ফোন এসেছিলো। আকাশে কিছু অদ্ভুত মেঘের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের রাডার জানিয়েছে যে, সেগুলো সাধারণ মেঘ নয় এবং মেঘগুলো দ্রুত গতিতে কলকাতার দিকে এগিয়ে আসছে।”

🌤️ সবাই উদ্বিগ্ন, চিন্তিত মুখে সচিবালয়ের জানলার দিকে এগিয়ে যায়। পশ্চিম আকাশের দিক থেকে ধীরে ধীরে সোনালী আভা ছড়িয়ে বিরাট এক মেঘপুঞ্জ এগিয়ে আসছে। মেঘের গায়ে চিকচিক করছে অজস্র-অগণিত আলোকবিন্দু – দিনের বেলাতেও যেন আকাশের বুকে নক্ষত্রবৃষ্টি হচ্ছে।

অনির্বাণ চুপ করে একবার আকাশের দিকে তাকায়, আর একবার তার যন্ত্রের স্ক্রিনে। সেখানে ফুটে উঠছে এক ক্ষীণ স্পন্দন – হয়তো সতর্কবার্তা। তার হাতের ঘড়িতে সময় দেখায় – বিকাল ৪.৩২। স্মার্টফোনে নোটিফিকেশন আসতে থাকে – আকাশে অচেনা বস্তুর উপস্থিতি, অজানা কারণে ইন্টারনেট স্লো।
“এখন কি হবে?” মুখ্যমন্ত্রীর গলায় আতঙ্ক।
অনির্বাণ তাঁর দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলে, “এখন তাদের কথা শুনতে হবে মাননীয়। আর নিজেদের ভুলগুলোকে শুধরে নিতে হবে। আগাছা হয়ে না থেকে এখন ফুল হয়ে ফোটার সময় এসেছে।”

সচিবালয়ের অফিসের বাইরে জনতা জড়ো হয়েছে। তাদের হাতে প্ল্যাকার্ড – “বৃষ্টি চাই, জীবন চাই।” কিন্তু আকাশের সেই বিশাল সোনালী আলোয় আলোকিত মেঘের দিকে তাকিয়ে জনতা স্তব্ধ হয়ে গেছে। এক অজানা আশঙ্কা, আর সম্ভাবনার রোদ যেন মিশে যাচ্ছে সোনালী আভায়।

অনির্বাণ আবার আকাশের দিকে তাকায়। বাতাসে ভেসে আসা এক ক্ষীণ শব্দ ধীরে ধীরে যেন প্রবল হতে থাকে – “তোমরা প্রস্তুত তো?”
অনির্বাণ বুঝতে পারে, হয়তো পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাক্ষী হতে যাচ্ছে আজকের এই মুহূর্ত। কোন পথে যাবে মানবসভ্যতা – ধ্বংসের দিকে নাকি শান্তির দিকে?


📘 পরবর্তী পর্বের ঘোষণা

“মেঘের বার্তাবাহক (দ্বিতীয় পর্ব)” — ধ্বংস না শান্তি? সেই সোনালী আলো কি নিয়ে আসবে পৃথিবীর জন্য অমৃত নিশান? নাকি নিঃশব্দে ঘোষণা করবে মহাবিশ্বের শেষ সতর্কবার্তা? জানতে পড়ুন আগামী পর্বে, শুধু গল্পের ঝুলি-তে।

💬 আপনার মতামত দিন

আপনি কি মনে করেন অনির্বাণের উচিত যন্ত্র ব্যবহার করে বৃষ্টি আনা? নাকি ভিনগ্রহের সভ্যতার সঙ্গে শান্তি আলাপ চালানো? মন্তব্যে জানান।

⭐ এই গল্পটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন ও বন্ধুদের পড়তে দিন।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন